অতিরিক্ত ক্যামিকেলের ব্যবহার ও গেটের তালা না খোলাই কাল হলো ৫২ শ্রমিকের

0
109

ডেস্ক রিপোর্ট : নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সজীব গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান হাসেম ফুড লিমিটেড কারখানায় অতিরিক্ত ক্যামিকেলের ব্যবহার ও গেটে তালা না খোলাই কাল হলো ৫২ শ্রমিকের। ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের এ মর্মান্তিক ঘটনায় রূপগঞ্জের চারপাশ শোকাহত। বিল্ডিং কোড না মেনে অব্যবস্থাপনায় এ ভবনটি নিমার্ণ করা হয়েছে বলে জানান ফায়ার সার্ভিস। এ ভবনটি নির্মাণের সময় কোন নিয়মই মানেনি কারখানা কর্তৃপক্ষ। প্রায় ৪০ ঘন্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে এনেছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। তবে এখনো লাশের অপেক্ষায় নিহতদের স্বজনরা। নিখোঁজের তালিকায় রয়েছে ৫৪ জন। নিখোঁজদের স্বজনরা তাদের খোঁজে কারখানা ও বিভিন্ন হাসপাতালে হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এদিকে, শনিবার বিকেল ৫টায় ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার কাজ সমাপ্ত করা হয়। আর সমাপ্ত করার বিষয়টি নিশ্চিত করেন, ঢাকা ফায়ার সার্ভিসের ডিডি দেবাশিষ রায়।

এ আগুনের ঘটনায় হত্যা ও হত্যার উদ্দেশ্যে সামন্য ও গুরুতর জখমের অপরাধে ভুলতা পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ইন্সপেক্টর নাজিম উদ্দিন মজুমদার বাদী হয়ে আট জনকে আসামী করে রূপগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। ওই মামলায় হাসেম ফুডের চেয়ারম্যান আবুল হাসেমসহ আটজনকে আসামী করা হয়েছে।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন, হাশেম ফুডের চেয়ারম্যান লক্ষীপুর জেলার চন্দ্রগঞ্জ থানার বালুচরা এলাকার মৃত ইব্রাহীম মিয়ার ছেলে আবুল হাশেম (৭০)। আবুল হাশেমের তার চার ছেলে হাসিব বিন হাসেম (৩৯), তারেক ইব্রাহিম (৩৫), তাওসিফ ইব্রাহিম (৩৩), তানজিব ইব্রাহিম (২১), বর্তমান ঠিকানা গুলশান-১, রোড নং-১৩, হাউজ নং-৪, থানা গুলশান ডিএমপি ঢাকা, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ব্রাক্ষ¥নবাড়িয়া জেলার কোট্টা থানার আতাউর রহমানের ছেলে শাহান শাহ আজাদ (৪৩), দিনাজপুর জেলার থানার নবাবগঞ্জ থানার হরিপুর এলাকার মৃত মনসূর আলীর ছেলে ডিজিএম মামুনুর রশীদ (৫৪), বরগুনা জেলার আমতলী থানার পশ্চিমচুনা খালী এলাকার আবু হানিফ খানের ছেলে অ্যাডমিন প্রধান সালাউদ্দিনকে (৩০)।

মামলা ও গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করে রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এএফএম সায়েদ বলেন, সকালেই রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে জেলা পুলিশ হাসেম ফুডের চেয়ারম্যান আবুল হাসেমসহ আটজনকে গ্রেফতার করেছে। এছাড়া গ্রেফতারকৃত ওই আট জনকে দশ দিনের রিমান্ড আবেদন চেয়ে নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ফাহমিদা খাতুনের আদালতে পাঠানো হয়েছে। আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।

এদিকে, দুপুরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল ঘটনাস্থল পরিদর্শণ করেছেন। রূপগঞ্জ উপজেলার সজীব গ্রুপের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান হাসেম ফুড লিমিটেড কারখানার আগুনের ঘটনায় তদন্ত হবে এবং দোষীদের বিচার হবে। গাফিলতি বিন্দুমাত্র থাকলেও কারো ছাড় নেই। এছাড়া ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) জিল্লুর রহমান ও জেলা পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম পৃথক প্রেস ব্রিফিং করেন। আগুন নেভানো শেষে ভবনটির অনেকাংশে ফাটল ধরেছে আবার অনেক অংশ ধংসে পড়েছে। এতে করে ভবনটিকে ঝুকিপূর্ণ বলে ঘোষনা দেয় ফায়ার সার্ভিস।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার বিকেল ৫ টার দিকে আগুনের সূত্রপাত হয়। আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে কাঞ্চন, আড়াইহাজার, পূর্বাচল, ঢাকা, নরসিংদীসহ ফায়ার সার্ভিসের ১৮টি ইউনিট কাজ করেন।

অপর দিকে, এ ঘটনায় ৩টি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শামিম বেপারীকে প্রধান করে ৫ সদস্যর একটি, ঢাকা ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক জুলফিকার রহমানকে প্রধান করে ৭সদস্য ও কারখানার পরিদর্শককে প্রধান করে ৩ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি করা হয়েছে।

অগ্নিকান্ডের ঘটনার প্রথম দিনে নারীসহ তিনজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। এরপর শুক্রবার বিকেলে ভবনের চারতলা থেকে ৪৯ জনের লাশ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। এ নিয়ে নিহতের সংখ্যা দাড়ালো ৫২ জনে। উদ্ধার হওয়া লাশ গুলো পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। চেনার কোন উপায় নেই। স্বজনরা চাইলেও লাশ দেখে শনাক্ত করতে পারবেননা। ডিএনএ টেস্ট ছাড়া লাশ শনাক্ত করা সম্ভব হবেনা। তবে তিন সপ্তাহ পরে লাশ শনাক্ত হবে জানায় ফরেনসিক ডিপার্টমেন্ট কর্তৃপক্ষ।

প্রিস ব্রিফিংয়ে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) জিল্লুর রহমান বলেন, অগ্নিকান্ডের সৃষ্টি হওয়া এই ভবনটিতে ক্রুটি ছিল। ভবন নির্মাণে মানা হয়নি কোন নির্দেশনা। এছাড়া ভবনে পর্যাপ্ত কোন ফায়ার এক্সিট পয়েন্ট ছিলনা। ছিল না কোন অগ্নি নির্বাপনের ব্যবস্থা। আমরা আগুন নেভানো শেষে কয়েকটি ফ্লোর তালাবদ্ধ অবস্থা দেখতে পেয়েছি। আমাদের উদ্ধার অভিযান শেষ হলে তদন্ত শুরু হবে। তারপর আগুনের সূত্রপাত ও অনিয়ম সম্পর্কে আরো বিস্তারিত আরো জানা যাবে।

জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) জায়েদুল আলম বলেন, ভবনটি ক্রুটিপূর্ণ ছিল। এ ঘটনা পুলিশ বাদী রূপগঞ্জ থানায় ৮ জনকে আসামী করে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ ঘটনায় চেয়ারম্যান আবুল হাসেমসহ ৮ জনকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

এদিকে, এখন পর্যন্ত ৫৪ জনের কোন খোঁজ মিলেনি। নিহতের স্বজনরা দিকবিদিক হয়ে কারখানা ও বিভিন্ন হাসপাতালে খোজাখুজি করছেন। নিখোঁজরা হলেন, মহিউদ্দিন পিতা- গোলাম সাং ভোলা চরফ্যাশন, শামীম পিতা- ফকরুল সাং- ভোলা চরফ্যাশন, হাফেজা পিতা- ইসমাইল সাং- ভোলা, ফিরোজা বেগম পিতা -হাকিম আলী সাং- নারায়ণগঞ্জ, নাইম পিতা-তাহের উদ্দিন সাং করিমগঞ্জ সদর, কিশোরগঞ্জ, শাহিদা পিতা- স্বপন সাং- কিশোরগঞ্জ, কম্পা বর্মণ পিতা- পর্বা বর্মণ সাং মৌলভী বাজার সিলেট, রাকিব পিতা তাইজ উদ্দিন, খাদিজা পিতা কাইয়ুম, কিশোরগঞ্জ গ্রাম শেওরা, শান্তামনি পিতা জাকির হোসেন সাং নেত্রকোনা, অমৃতা বেগম পিতা স্বামী সেলিম, নবীগঞ্জ. আকিমা পিতা কাইয়ুম সাং কিশোরগঞ্জ, হিমা পিতা কবির হোসেন সাং খালিয়াঝুড়ি নেত্রকোনা, স্বপন পিতা মনকার রংপুর, শাহানা পিতা স্বামী মাহাতাব উদ্দিন, সাং কিশোরগঞ্জ জালিয়াপাড়া, আমেনা স্বামী রাজীব সাং গোলাকান্দাইল খালপাড়া, রূপগঞ্জ, মিনা খাতুন পিতা আব্দুর রশিদ, কিশোরগঞ্জ, ফাতেমা আক্তার, পিতা সূজন সাং কিশোরগঞ্জ, পারভেজ পিতা আহসান উল্লাহ মিজী, সাং হাইমচর চাঁদপুর, মাহবুব সেকশন ম্যানেজার পিতা গকুল সাং তেতুলিয়া বাঘা রাজশাহী, রিপন মিয়া- পিতা সেলিম মিয়া সাং গাজীপুর, নোমান মিয়া পিতা মান্নান মিয়া, সাং ভোলা চরফ্যাশন, নাজমা বেগম স্বামী আফজাল স্বামী আফজাল হোসেন সাং রূপগঞ্জ, মোহাম্মদ আলী পিতা শাহাদাত খান সাং হাটখালী, হুসাইন পিতা ফজলু সাং চরফ্যাশন ভোলা, জিহাদ মোঃ শওকত সাং জামালপুর, সেলিনা মো সেলিম সাং মিঠামইন কিশোরগঞ্জ, ফিরোজা মেয়ে সুমাইয়া সাং ভুলতা, রিমা স্বামী জসিম উদ্দিন সাং রূপগঞ্জ রাকিব পিতা কবির সাং চরফ্যাশন, ভোলা, ফারজানা পিতা : সুরুজ আলী, নাজমুল, পিতা চাঁনমিয়া সাং কিশোরগঞ্জ, তাছলিমা পিতা বাচ্চু মিয়া সাং কিশোরগঞ্জ, রাকিব সাং চরফ্যাশন ভোলা, আকাশ পিতা বাহার সাং নোয়াখালি, রাশেদ পিতা আবুল কাশেম সাং নোয়াখালি, বাদশা পিতা এনায়েত সাং ফরিদপুর, ইউসূফ, সাকিল, জাহানারা, রাহিমা, নূসরাত জাহান টুকটুকি, রাবেয়া, মাহমুদা, তাকিয়া আক্তার, ইসরাত জাহান, শাহানা, সাজ্জাদ হোসেন সজীব, লাবন্য আক্তার, করিমা, সুপান, আসিফ। সকলেই উপজেলার গোলাকান্দাইল এলাকা ও নতুন বাজার এলাকায় বিভিন্ন বাড়িতে ভাড়া থেকে ওই কারখানায় কাজ করতো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here