তুচ্ছ বিরোধেও অস্ত্রের মহড়া ॥ উদ্ধারে নেই পুলিশের তৎপরতা

0
495

মাহবুব আলম প্রিয় : নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে জমি নিয়ে বিরোধ, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, আবাসনের দৌড়াত্ম্য লালিত দখলবাজদের এমনকি তুচ্ছ ঘটনার বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে দিনদুপুরে দেখা যায় দেশীয় ও আগ্নেয়াস্ত্রের মহড়া। এ মহড়ায় তরুণ থেকে শুরু করে বয়স্করাও প্রতিপক্ষের বাড়ি ঘরে হামলা করে ভাংচুর, লুটপাট চালায়। শুধু তাই নয়, রাজনৈতিক ছত্রছাঁয়ায় কতিপয় নেতা কর্মী এবং চিহ্নিত সন্ত্রাসীমহলও প্রকাশ্যে এমন অস্ত্রের মহড়া চালায়। এতে জননিরাপত্তাহীনতা বেড়েই চলছে। এসব বিষয়ে রূপগঞ্জ থানা ও আদালতে মামলা হলে অভিযোগ কিংবা এজাহার দেশীয় ও আগ্নেয়াস্ত্রের কথা উল্লেখ থাকে। কিন্তু রহস্যজনক কারনে ওইসব অস্ত্র উদ্ধারে রূপগঞ্জ থানা পুলিশের তৎপরতা কম থাকায় জনমনে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে

সূত্র জানায়, পূর্ব শত্রুতার জেরে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের দাউদপুর ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ড আওয়ামীলীগ সভাপতি আব্দুস সোবহানকে কুপিয়ে জখম করে তার প্রতিপক্ষরা। ১৭ এপ্রিল শনিবার দিবাগত রাতে উপজেলার বেলদী এলাকায় ওই ঘটনায় থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়। ওই অভিযোগে লেখা হয়, দেশীয় অস্ত্রসহ প্রতিপক্ষের ৭/৮জন লোক রাম দা, চাইনিজ কুড়াল নিয়ে হামলা চালায়। বাড়ি ঘর লুট করে। এ বিষয়ে মামলা রুজু করা হয়। কিন্তু কোন অস্ত্র উদ্ধার করা হয়নি।

একইভাবে ১৯ এপ্রিল ভুলতা ইউনিয়নের মাঝিপাড়া গ্রামে আমপাড়া নিয়ে দুই পরিবারের বিরোধের জেরে দেশীয় অস্ত্র প্রদর্শণ করে একে অপরের বাড়ি ঘরে হামলা ভাংচুর চালায়। গ্রামবাসিদের বরাত ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, নারী পুরুষ প্রায় সবার হাতে বড় রাম দা, ছুড়ি, বল্লম নিয়ে উভয় পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। তাদের হাতে থাকা অস্ত্রের সবগুলোই আইনত অবৈধ।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)‘র অধীনে নির্মানাধীন পরিকল্পিত পূর্বাচল নতুন শহর ঘিরে বিগত দুই যোগ ধরে আশপাশের ইউনিয়নের বিভিন্ন মৌজায় গড়ে ওঠছে আবাসন কোম্পানী। তারা স্থানীয়দের জমি দখলে স্থানীয় সন্ত্রাসী ও প্রভাবশালীদের ব্যবহার করেছেন। আর তাদের ক্ষমতার জানান দিতে জমি মালিকদের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ করলেই দল বেধে হামলা করে বাড়ি ঘর ভাংচুরের ঘটনা ঘটায়।

সূত্র আরো জানায়, প্রভাব টিকিয়ে রাখতে উঠতি বয়সী তরুণদের হাতে দেয়া হচ্ছে ভয়ঙ্কর সব অস্ত্র। এসব অস্ত্র ব্যবহারে তরুণরাই আগ্রহী বেশি। এমন এক ঘটনায় উপজেলার দাউদপুরের খৈসাইর এলাকায় একটি গার্মেন্স নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাকারী স্থানীয় স্কুল পড়ুয়া তরুণরা আগ্রহবশত দেশীয় অস্ত্র হাতে ফেসবুকে পোস্ট করে। এ নিয়ে এলাকায় চরম আতঙ্ক বিরাজ করে।

বলাইখার বাসিন্দা কবি ও সাংবাদিক আলম হোসেন বলেন, সারা বছর ধরেই রূপগঞ্জে অস্থিরতা বিরাজ করে। চুরি, ডাকাতি, খুনখারাবি আর অস্ত্রের ঝনঝনানির ঘটনা শুনে থাকি। হামলা সংঘর্ষের ঘটনাই বেশি। এতে আহত নিহতও বেশি। যদিও এজাহারে দেশীয় অস্ত্রের কথা উল্লেখ থাকে, কিন্তু ওই অস্ত্র উদ্ধার বা জব্দ করতে দেখা যায় না। ফলে অস্ত্রগুলো ওই সন্ত্রাসীদের কব্জায়ই থাকে। যা জননিরাপত্তায় চরম ঝুঁকিপূর্ন।

এ বিষয়ে রূপগঞ্জ থানা (ওসি তদন্ত) চার্জ কর্মকর্তা এইচ এম জসিম উদ্দিন বলেন, অভিযোগ ও এজাহারে অনেকেই লিখে অস্ত্র নিয়ে হামলা করে। ঘটনা তদন্তের পর দেখা যায় ঘরে থাকা ব্যবহৃত দা বটি, লাঠিসোটাই ই ব্যবহার হয়েছে। তবে বহু ঘটনায়ই বেআইনি অস্ত্রের ব্যবহার হয়। ওইসব অস্ত্র উদ্ধারের জন্য পুলিশ অভিযুক্তের বাড়ি ঘর তল্লাশি করে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে জড়িতদের আইনের আঁওতায় আনা হবে।

এরআগে ২০১৭ সালে রূপগঞ্জ থেকে অস্ত্রের বিশাল মজুত উদ্ধার করে পুলিশ। ২ জুন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের পূর্বাচল উপশহর থেকে মজুত করা বিপুল পরিমান আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের তালিকায় ছিল আইএসের ব্যবহৃত ৬২ টি চাইনিজ এসএমজি, ৪২ টি হ্যান্ড গ্রেনেড, ২ টি রকেট লাঞ্চার, ৪৯ টি রকেট লাঞ্চারের প্রজেক্ট, ৬০ টি ম্যাগাজিন, ৫ টি পিস্তল ও ২ টি নন ট্র্যাকার ওয়াকিটকিসহ বিপুল পরিমান গুলি।

সম্প্রতি কাঞ্চন পৌর আওয়ামীলীগ বিরোধকে কেন্দ্র কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের লোকজন প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে হামলা করার ঘটনা সিসি টিভি ক্যামেরায় ধরা পরে। ওই বিরোধ এখানো নিষ্পত্তি না হওয়ায় কাঞ্চন পৌরসভার সাধারন লোকজন চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। এ বিষয়ে কাঞ্চন পৌর মেয়র রফিকুল ইসলাম রফিক বলেন, ক্ষমতা দাপট দেখাতে সন্ত্রাসী বাহীনি দিন দুপুরে দেশীয় ও আগ্নেয়াস্ত্রসহ হামলা করেছে আমার পৌর কার্যালয়েও। এসব সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়লেও যারা অস্ত্র প্রদর্শন করেছে তা দেখানো অস্ত্রগুলো উদ্ধার করেনি পুলিশ।

সূত্র জানায়, রাজনৈতিক বিরোধের জেরে উপজেলার ভুলতা গাউছিয়া মার্কেট এলাকায় সবচেয়ে বেশি অস্ত্র নিয়ে হামলার ঘটনা ঘটে। এখানে পরিবহণ ও ফুটপাত চাঁদাবাজরা তাদের দৌড়াতœ্য রক্ষায় ব্যবহার করে দেশীয় অস্ত্র। সামান্য কথা কাটাকাটি হলেও অস্ত্র নিয়ে হামলা করে তারা। এদের মাঝে চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ এবং তাদের অস্ত্রগুলো অধরা থাকায় স্থানীয় ব্যবসায়ী মহলেও আতঙ্ক বিরাজ করছে।

সূত্র জানায়, রূপগঞ্জে সরকারদলীয় গ্রুপ, মেয়র গ্রুপ, চেয়ারম্যান গ্রুপ, মেম্বার গ্রুপ, ওমক গ্রুপ, তোমক গ্রুপ এমন নানা নামে নানা পরিচয়ে ৩ ডর্জন গ্রুপের অর্ধসহস্রাধিক সন্ত্রাসী ব্যবহার করছে আগ্নেয়াস্ত্র। শত শত ‘বৈধ অস্ত্রের’ ছড়াছড়ির মধ্যে ‘অবৈধ অস্ত্রের’ খোঁজ নেই পুলিশের। আবার মিল-কারখানায় চাঁদাবাজি করতে যাওয়া, বাড়ি দখল, ছিঁচকে সন্ত্রাসীদের আগ্নেয়াস্ত্র থেকেও গুলিবর্ষণের খবর পাওয়া যায় প্রায়ই।

আবার উপজেলার কায়েতপাড়া ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডটি চনপাড়া বস্তিতে রাজধানীর শীর্ষ সন্ত্রাসীদের আত্মগোপনের নিরাপদ আশ্রয় বলে জানা হয়। ফলে বহিরাগত অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের আনাগোনা বেড়ে গেছে সেখানে। বেড়ে গেছে অস্ত্রের ঝনঝনানি।

এসব বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার (এসএসপি- গ সার্কেল রূপগঞ্জ-আড়াইহাজার) আবির হোসেন বলেন, এ সার্কেলে আমি নতুন যোগ দিয়েছি। ফলে এখনো সব তথ্য জানা নেই। তবে এজাহারে উল্লেখিত অস্ত্রগুলো উদ্ধার চেষ্টায় পুলিশ তৎপর থাকে। সন্ত্রাসীদের লুকিয়ে রাখা অস্ত্র সুনির্দিষ্ট তথ্যের অভাবে অনেক সময় জব্দ করা যায় না। অস্ত্র উদ্ধারে আরো তৎপর হয়ে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here