রূপগঞ্জে তাবিজ তৈরির উপর নির্ভর ৫’শ পরিবার

0
222

স্টাফ করেসপনডেন্ট : গ্রামের ভেতরে প্রবেশ করতেই হাতুড়ির খট খট শব্দ শোনা যাচ্ছে। একটু কাছে যেতেই দেখা যায় পরিবারের পুরুষদের পাশাপাশি নারীরা তাবিজ তৈরীতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। কেউ তাবিজের তৈরীর কাচাঁমাল প্রস্তুত করছেন কেউবা আবার তাবিজ আগুনে দিয়ে তাবিজ প্রস্তুত করছেন। বাপ দাদার ২’শ বছরের পুরনো পেশাকে বাচিঁয়ে রেখেছেন তারা। বলা হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার সদর ইউনিয়নের মুশুরী, দক্ষিণবাগ ও ভিংরাবো গ্রামের কথা। কয়েকশ বছর পার হয়ে গেলেও এখনও তারা পুরনো সেই পেশায় নিজেদের নিয়োজিত রেখেছেন। এ তিনটি গ্রামের প্রায় ৫’শ পরিবার এ পেশার সঙ্গে জড়িত হয়ে জীবিকা নির্বাহ করছে। তাবিজ তৈরির কাজে নারী-পুরুষদের পাশাপাশি শিশু-কিশোররাও জড়িত। লেখাপড়ার পাশাপাশি শিশু-কিশোররা এ কাজে ব্যস্ত সময় কাটায়। নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয় এ তাবিজ।

 

তাবিজ সাধারনত বিভিন্ন ঝাড়-ফুকসহ বিভিন্ন কাজে লেগে থাকে। প্রতি মাসে এক একটি পরিবার প্রায় ৬ থেকে ৮ হাজার তাবিজ তৈরি করেন। সে হিসেবে ওই তিনটি গ্রামে তাবিজ তৈরি হয় প্রায় ৩০ লাখ। এসকল তাবিজের আবার বিভিন্ন প্রকার আঞ্চলিক নামও রয়েছে যেমন-সাম্বু, বাম্বু, পাই, বড় মাজলা, ছোট মাজলা, মস্তুলসহ প্রাথ অর্ধশত নাম। উপজেলার সদর ইউনিয়নের মুশুরী, দক্ষিণবাগ ও ভিংরাবো গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে তাবিজ তৈরীর কারিগরদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়।

 

জানা যায়, বিভিন্ন প্রকার ও বিভিন্ন ধরনের তাবিজ রয়েছে। এর মধ্যে লোহার তাবিজের মূল্য সবচেয়ে কম। এছাড়া পিতল, রুপা ও স্ব^র্ণের তাবিজ আলাদা অর্ডারের মাধ্যমে তৈরি করেন তারা। তাদের তৈরী তাবিজ বিক্রি করা হয় হাজার অথবা শতক হিসেবে। এ পরিবার গুলো প্রতিমাসে প্রায় অর্ধকোটি টাকার তাবিজ তৈরী করেন। তাবিজ সাধারনত দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলাসহ বিদেশে রপ্তানি করা হয়ে থাকে। বিশেষ করে পাকিস্থান ও ভারতে তাবিজের চাহিদা অনেকটা বেশি। পাইকাররা এখান থেকে তাবিজ ক্রয় করে বিভিন্ন মাধ্যমে দেশ-বিদেশে বিক্রি করে থাকেন। বর্তমানে এ পেশাটা লাভজনক হওয়ায় হিন্দু পরিবারের পাশাপাশি মুসলমান পরিবার গুলো এ পেশার সঙ্গে জড়িয়েছেন।

 

তাবিজ তৈরির কারিগর শহিদুল ইসলাম জানায়, যুগ যুগ ধরে তাদের বাপ-দাদারা এ পেশায় জড়িত ছিল। তারাও এ পেশাটি ধরে রেখেছেন। তাবিজের দাম হিসেবে এর খরচ বর্তমানে অনেকটা বেশি। তারপরও তাবিজ তৈরি করে কারিগররা অনেকটা লাভের মূখে রয়েছেন। তবে পুজির অভাবে তারা তাদের ব্যবসা সম্প্রাসারণ করতে পারছে না। সরকারিভাবে সহজ শর্তে ঋণ পেলে এ পেশাটাকে আরো লাভজনক অবস্থায় নিয়ে যেতে সম্ভব হতো।

 

কথা হয় নরুল হক নামে তাবিজ কারিগরের সাথে তিনি বলেন, আমাদের তৈরী তাবিজ কুমিল্লা, যশোর, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, ব্রাক্ষ্মনবাড়িয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকাররা এসে তাবিজ কিনে নিয়ে যায়। পাইকাররা প্রতি মাসের শেষের দিকে এসে তাবিজ কিনেয় নিয়ে যায়। কখনো কখনো আমরাও নরসিংদী, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন হাঁটে গিয়ে তাবিজ বিক্রি করে আসি।

 

 

গৃহবধূ শিরিনা বেগম জানান, তিনি ঘরের কাজের পাশাপাশি অবসর সময়ে তাবিজ তৈরী করেন। এতে করে তার সংসারে বাড়তি আয়ের ব্যবস্থা হচ্ছে। তাবিজ তৈরীতে ভাল আয় হওয়ায় তিনিও তার স্বামীর পাশাপাশি সংসার চালাতে অবদান রাখছেন। তার অর্জিত বাড়তি আয় দিয়ে স্বপ্ন দেখছে একমাত্র ছেলেকে মানুষের মতো মানুষ গড়ে তোলার।

 

শত বছর বয়সী তাবিজ কারিগর শৈতা রানি দাস বলেন, ”বাবারে আমার শশুর-শাশুরী এ তাবিজ বানাইতো, এহন আমিও ওনাগো ঐতিয্য ধইরা রাখছি। আমার পোলা মাইয়া, নাতিন-নাতœীরেও কইছি তোমরা এই তাবিজ বানানের কাজ ধইরা রাখবা।”

 

ফোনে কথা হয় তাবিজের পাইকার অভিলাস দাসের সঙ্গে তিনি বলেন, আমরা এ গ্রাম গুলো থেকে মাসের শেষে এসে তাবিজ কিনে নিয়ে যাই। এ তাবিজ ঢাকাসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল গুলোতে বিক্রি হয়ে থাকে। এছাড়া ভারত ও পাকিস্তানে তাবিজের ব্যপক চাহিদা থাকায় এগুলোকে বিদেশেও রপ্তানি করা হচ্ছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে। তাবিজ কেনার জন্য কখনো কখনো কারিগরদের মাসের শুরুতে আগাম টাকা দিয়ে দিতে হয়। সরকারি সুযোগ সুবিধা পেলে তাবিজ শিল্প আরো এগিয়ে যাবে।

 

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহ্ নূসরাত জাহান বলেন, তিনটি গ্রামের অনেকেই তাবিজ তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন শুনেছি। এখন তাবিজ তৈরির শিল্পটা টিকিয়ে রাখতে কারিগরদের সঙ্গে কথা বলা হবে। এছাড়া কথা বলে তাদের কি কি সুযোগ-সুবিধা দেয়া যায় সে ব্যপারেও সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here