চিঠি : মুখে বলা যায় না যে কথা..

0
189

লেখকঃ আতিক হেলাল

‘চিঠি দিয়ো প্রতিদিন, চিঠি দিয়ো’…
‘বিদেশ গিয়া বন্ধু তুমি আমায় ভুইলো না /
চিঠি দিয়ো, পত্র দিয়ো, জানাইয়ো ঠিকানা।’

এখন ইমেল-এস্এমএস, ফেসবুক-টুইটারের যুগ। এখন কোন বার্তাই আর আগের মত সময় নেয় না। তারপরও চিঠির জন্য নারী তথা প্রেমিক-হৃদয়ের এই উদগ্রীব আকুতি চিরত্তন ও শাশ্বত। তার কাছে এই চিঠি কেবল নিরেট কোনো বার্তাবাহী পত্রলিপিকা মাত্রই নয়, হৃদয়ের বাকরহিত অনেক পুঞ্জীভূত কথার সুবিন্যস্ত ফুলঝুরি যেন এই চিঠি। যে চিঠিতে জড়িয়ে থাকে অন্তরের মণি থেকে উৎসারিত মমতা দিয়ে গাঁথা ভালোবাসার এক উজ্জ্বল নিদর্শন। এই চিঠি যেন তার জন্য এক সুকোমল আশ্রয়; মনোজ শক্তি ও বিশ্বাসের পরাকাষ্ঠা। তাই তো নারী তথা প্রেমিক-হৃদয় গেয়ে উঠতে পারে; ‘চিঠি আসবে, জানি আসবে/ তোমরা সবাই দেখো, সে যে ফিরে আসবে।’ অর্থাৎ দূরবাসী প্রিয়তম মানুষটির চিঠিপ্রাপ্তি মানেই তাকে ফিরে পাওয়ার নিখাদ আশ্বাস।

প্রত্যক্ষভাবে মুখে যে কথা বলা হয়ে ওঠে না, একমাত্র চিঠিই কিন্তু পারে সেই কথা প্রকাশ করতে; পারে পৌঁছে দিতে আরাধ্য মানুষটির মনের মণিকোঠায়। চিঠি যেন এক পরম আশ্রয়, বিশ্বস্ততার প্রতীক।

অলস দুপুরে যখন..

চিঠি এক প্রামাণ্য দলিল। নিটোল এক কবিতা। চিঠির ভাষায় উঠে আসে মানস-মনোভূমির অনুপুঙ্খ পরিচিতি। চিঠি এক নাটকীয় ঘটনা। অলস দুপুরে ডাকপিয়ন যখন কড়া নাড়ে দরজায়, তখনই মনের মধ্যে অনির্বচনীয় এক ভাবান্তর- কে লিখেছে, কী লিখেছে? কিছুটা শঙ্কা, কিছুটা ভালোবাসা; চিঠি সবসময়েই আকাক্সিক্ষত পরম প্রত্যাশা। সুতরাং, সুসংবাদ, দুঃসংবাদ, যা-ই লেখা থাকুক না কেন, চিঠি যে এক প্রকার ‘সুখ’ তাতে কারো দ্বিমত নেই।

কবে থেকে এই চিঠি :

চিঠির উৎপত্তি ঠিক কবে হয়েছিলো, সে ব্যাপারে ঐতিহাসিক চূড়ান্ত কোন ব্যখ্যা-প্রমাণ পাওয়া যায় না। ধারণা করা হয় যে, লিপি বা অক্ষরের সমবয়সী/কাগজ আবিষ্কারের পর এই চিঠি হয়ে ওঠে যোগাযোগের সবচেয়ে প্রিয় এবং কার্যকরী মাধ্যম।

চিঠির কত যে রূপ

বিচিত্র সব বিষয়, বলতে গেলে সমাজ জীবনের প্রতিটি বিষয়ের ওপর চিঠি লিখতে হয়। যেমন- ব্যক্তিগত চিঠি, পারিবারিক চিঠি, বন্ধু-বান্ধবের চিঠি, প্রেমের চিঠি, হালখাতার চিঠি, নিমন্ত্রণের চিঠি, চাকরির চিঠি, অফিসিয়াল চিঠি, আদালতের চিঠি, চাঁদাবাজির চিঠি, অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের চিঠি, ডাকাতির চিঠি, বৈদেশিক চিঠি, শুভেচ্ছা ও শোকের চিঠি ইত্যাদি আরো হরেক রকম চিঠি রয়েছে।

ঐতিহাসিক চিঠি :

ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, অনেক সময়ে একটি চিঠি পাল্টে দিয়েছে কোনো যুদ্ধের ফলাফল, নতুন বাঁক পেয়েছে একটি জীবন বা সমগ্র জাতি। হযরত মুহাম্মদ (সা.) ইসলামের দাওয়াত দিয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রনায়কের কাছে চিঠি দিয়েছিলেন। লাইনে লাইনে সাম্যবাদী রাষ্ট্রের রূপ রেখা এঁকে বলিভিয়া থেকে চেকুয়েভারা চিঠি পাঠিয়েছিলেন কিউবার ফিদেল ক্যাস্ট্রোকে। নেহরু তার কিশোরী কন্যা ইন্দিরাকে লিখেছিলেন অসংখ্য চিঠি, যা ‘মা মনিকে লেখা চিঠি’ হিসেবে বহুল প্রচারিত।
কয়েক দশক আগে এক মার্কিন কিশোরী সামান্থা চিঠি লিখেছিলো রুশ নেতা গর্বাচেভকে আণবিক বোমা কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার আবেদন জানিয়ে।
মারিয়ার চিঠি নিয়ে পত্রবাহক যাচ্ছিলো মদীনায়। তিনি তার পুত্র এজিদের ষড়যন্ত্রের কথা লিখেছিলেন হুসাইন (রা.)-কে। পথে এজিদের গুপ্তচরের হাতে মারা যায় পত্রবাহক। হুসাইন (রা.) সেই চিঠি পেলেন না। পেলে কারবালার অমন নির্মম উপাখ্যান হয়তো রচিত হতো না।
বিভিন্ন দেশে এবং বাংলাদেশেও রাজনৈতিক সংকটকালে অনেক সময়ে চিঠি চালাচালি কালচার বেশ ভালোভাবেই জমে উঠতে দেখা যায়। ওদিকে ভারতের রাজীব গান্ধীকে লেখা এক চিঠির মধ্যে পাওয়া গিয়েছিলো ছোট আকারের বিষাক্ত সাপ। মায়ের চিঠি পেয়ে ঈশ্বরচন্দ্র ছুটি না পাওয়ায় চাকরি ছেড়ে দিয়ে ছুটলেন দুর্যোগের রাতে ফুঁসে ওঠা দামোদর নদী সাঁতরে মায়ের কাছে। যুদ্ধে নিহত ছেলের পকেটে মায়ের কাছে লেখা চিঠি পাওয়ার ঘটনাও আছে অনেক। এছাড়া আত্মহত্যা করে অনেক নারী-পুরুষকে এই অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যুর কারণ অথবা আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়Ñ বলে চিঠি লিখে রেখে যেতে দেখা যায় অহরহ।

মিনি চিঠি চিরকুট :

অভিনেত্রী ডলি আনোয়ার আত্মহত্যার আগে লিখেছিলেন : ‘জীবন খুব সুন্দর। আমি জীবনটাকে সুন্দর দেখে চলে যেতে চাই।’ প্রেমিক লিখলো প্রেমিকাকে : ‘ঠিক পাঁচটায় দেখা হবে মিলন চত্বরে।’ বান্ধবী খিললো বান্ধবীকে : ‘তোর হলুদ শাড়িটা এক্ষুনি পাঠিয়ে দেনা।’ মিনি চিঠি চিরকুট এগুলোই।

চিঠি : আবালবৃদ্ধবনিতার :

পাঁচ-ছয় বছরের এক বালক। মা তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘খোকা, তুমি সারা দুপুর কোথায় ছিলে, কী করেছো?
-মা, আমি আর পাশের বাড়ির তিন্নি মিলে পিয়ন পিয়ন খেলেছি।
-সে আবার কীরকম খেলা, বাবা?
-আমরা পাড়ার প্রত্যেক বাড়িতে চিঠি বিলি করলাম।
-এতো চিঠি পেলে কোথায় তোমরা?
-কেন, ঐযে তুমি একদিন বললে, ড্রেসিং টেবিলের নিচের ড্রয়ারে একগাদা চিঠি, যেগুলো বিয়ের আগে বাবাকে লিখেছিলে, সেই চিঠিগুলো দিয়েই তো পিয়ন পিয়ন খেলেছি।’

বাচ্চা এক হিন্দু ছেলে। খামে ভরে সে চিঠি লিখে পাঠিয়েছিলো ‘ভগবানের’ উদ্দেশ্যে। লিখেছিলো : ‘ভগবান, আমার ভীষণ টাকার দরকার। আমাকে দুশ’ টাকা পাঠিয়ে দাও; নইলে আমি আত্মহত্যা করবো।’ স্বাভাবিকভাবেই সে চিঠি ভগবানের কাছে পৌঁছুলোনা। পৌঁছুলো ডাকবিভাগের রিটার্নড লেটার অফিসে। ডাকবিভাগের কিছু লোক কৌতুহলবশত এই অদ্ভুত চিঠিটা সেখানে পড়ে ফেললো। দয়াপরবশ হয়ে তখন তারা নিজেরা চাঁদা তুলে একশ’টি টাকা মানি অর্ডারে পাঠিয়ে দিলো ঐ ছেলেটির কাছে। টাকা পেয়ে খুশি হয়ে ছেলেটি আবার চিঠি লিখলো ভগবানের কাছে : ‘টাকাটা পাঠানোর জন্য তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। কিন্তু, আমিতো তোমার কাছে দুশ’ টাকা চেয়েছিলাম, তুমি একশ’ টাকা পাঠালে কেন? আমার বিশ্বাস তুমি দুশ’ টাকাই পাঠিয়েছিলে; পোস্ট অফিসের লোকেরা একশ’ টাকা মেরে দিয়েছে।’

চিঠির একাল-সেকাল :

চিঠির একাল-সেকালের ভাষাভঙ্গী আঙ্গিক, গঠন- সবকিছুই আলাদা। আগেকার রীতি এখন প্রায় বিলুপ্ত। সময় যেন সবকিছুই পাল্টে দিচ্ছে। এখন ইমেল-এস্এমএস, ফেসবুক-টুইটারের যুগ। এখন কোন বার্তাই আর আগের মত সময় নেয় না। এখন সেইসব চিঠির বাণী শুধুই স্মৃতি। যেমন- ‘লিপিকার শুরুতেই আমার শতকোটি সালাম ও কদমবুছি’, ‘পর সমাচার এই যে’ ধরনের সম্ভাষণ কিংবা ‘ইতি তোমারই…’ জাতীয় অলঙ্কার প্রয়োগের ঐতিহ্যগত ধারা। এখন আধুনিক প্রজন্ম খেলছে নতুন নতুন ভাষাশৈলী নিয়ে। চিঠি এখন স্মার্ট, উৎকর্ষে ভরা ও সাহিত্যধর্মী। স্কুলের ব্যকরণ বইয়ে শেখা সংবাদপত্রের চিঠিও এখন মোটেই সেরকম নয়। তা এখন অনেক প্রাণবন্ত, বাস্তবানুগ। যেভাবে কথা বলি, চিঠি এখন সেভাবেই লেখা হয়।

প্রেমপত্রের সাতকাহন :

কালে-কালে প্রেমপত্রের ধরনও বড় বিচিত্র। এতে এখন অতিমাত্রায় রোমান্টিকতা যেমন থাকে, তেমনি থাকে নানাবিধ আতিশয্যও। নিজের শরীরের রক্ত দিয়ে আবেগময় অনুভূতি মিশিয়ে চিঠি লেখার ঘটনাও ঘটছে। কেউবা চিঠির মধ্যে দিয়ে দেয় ফুলের পাপড়ি কিংবা চিঠিতে মাখিয়ে দেয় পারফিউম বা সুগন্ধী পাউডার। অনেকে এঁকে দেয় নকশা বা আল্পনা। আবার কেউবা নানারঙের স্টিকার এঁটে দেয় চিঠির সাথে।

আরও কত কী!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here