কৃষি ব্যাংকের পূর্বাচল শাখায় ঘুষ ছাড়া মিলে না সেবা : ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ

0
258

মাহবুব আলম প্রিয় (নিজস্ব প্রতিবেদক) : বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের পূর্বাচল শাখায় গ্রাহক ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। এলাকাভিত্তিক দায়িত্বরত কর্মকর্তা ও দালালদের যোগসাজস ছাড়া মেলেনা কোন প্রকার সেবা। আর সংশ্লিষ্ট দালাল মাধ্যমে কর্মকর্তাকে শতকরা ১০- ভাগ থেকে কাগুজে ঝামেলা দেখিয়ে ৩০ ভাগ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে ঘুষ দিয়ে তদন্ত ছাড়াই মেলে গ্রাহক সেবা।

শুধু তাই নয়, দালাল মাধ্যমে ইউপি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া ব্যক্তিদের অলিখিত খেলাপিমুক্ত সনদ নিতে বাধ্য করে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। এতে সুবিধা পাওয়া দালালের অধীনস্থ ব্যক্তিরা ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েও মুখ না খোলায় বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে পারছেনা উর্ধ্বতন মহল।আবার লোকবল সংকট দেখিয়ে নৈশ প্রহরীর কব্জায় রাখা হয়েছে ব্যাংকের নথি। ফলে প্রহরীকে খুশি করলে জানা যায় গ্রাহকের তথ্য।

এমনই চিত্র দেখা গেছে ওই কৃষিব্যাংকের শাখা থেকে সেবা নিতে আসা গ্রাহকদের।

সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, উপজেলার ইছাপুরা বাজারে রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একটি শাখা। এ শাখায় বর্তমানে গ্রাহক সংখ্যা ৫ হাজার ৪ শত প্রায়। এদের মাঝে কৃষি জমির কাগজ পত্রাদি বন্দক রেখে নির্ধারিত সুদ দেয়ার সহজ শর্তে স্থানীয় কৃষকদের মাঝে ঋণ বিতরণ ও লোন নেয়া গ্রাহকের সংখ্যা রয়েছে। সূত্র জানায়, লোন নেয়া ও সাধারন গ্রাহকের সংখ্যার অনুপাত ৫:৫। যাদের মাঝে জরুরী ঋণ গ্রহিতার বেশিরভাগ হতদরিদ্র। তারা তাদের সর্বস্ব এ ব্যাংকে আমানত রেখে বাধ্য হয়ে লোন নেন।

আর এই ব্যাংকের পূর্বাচল শাখায় কর্মরত বিগত ৩ বছরের অধিক সময় ধরে দাউদপুর অঞ্চলের তদন্তের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা ইয়াসিন আরাফাত স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে গড়ে তুলেছে সিন্ডিকেট। ওই দালাল সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ব্যাংকের ম্যানেজার ও তাদের কমিশন বাবদ গ্রাহক থেকে শতকরা ১০ভাগ কমিশন কেটে নিচ্ছে। এতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্থ গ্রাহকরা। ওই কেটে নেয়া কমিশনেরও সুদ দিতে হচ্ছে তাদের। আবার ব্যাংকের টাকা আতœসাৎ করতে রয়েছে একটি জালিয়াত চক্র । ্ওই জালিয়াত চক্রটি ভুমি অফিস থেকে নকল সার্টিফাইড পর্চা ও দলিল তৈরী করে ঋণ বাগিয়ে নিচ্ছে। বিক্রিত জমির কাগজ জমা বাবদও রয়েছে ঋণ নেয়ার নজির।

একইভাবে ইউপি নির্বাচনী প্রার্থী হওয়াদের মাঝে আতঙ্ক তৈরী করে দালাদ চক্র। ব্যাংকের কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে সংশ্লিষ্ট নির্বাচন কর্মকতার কার্যালয়ে খেলাপীমুক্তি সনদ জমা বাধ্যতামুলক প্রচার করে প্রার্থী প্রতি সনদ বাবদ ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ঘুষ নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও খেলাপী ব্যক্তিকে দায়মুক্তি সনদ দিয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে সুযোগ করে দেয়। যদিও উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান এ ধরনের বাধ্যবাধকতার বিষয়টি জানা নেই বলে দাবী করেন। আর এসব বিষয়ে দালাল মাধ্যমে কৃষি ব্যাংক কর্মকর্তাকে ঘুষ দিলে কোন রকম তদন্ত ছাড়াই হয় লোন পাশ। এতে চতুর ও প্রতারক শ্রেণির গ্রাহকরা ঋণ পেলেও সাধারন গ্রাহকরা হয়রানীর শিকার হচ্ছেন।

নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক বেলদী এলাকার গ্রাহক জানান, ইছাপুরার পূর্বাচল শাখা থেকে তার নামে ৫ লাখ টাকা লোন তুলতে কৃষি জমির কাগজ পত্র জমা দিয়ে ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। ওই ঘুষের টাকা বেলদী এলাকার মৃত বোরহান মিয়া ছেলে রাকিব নামের দালালের মাধ্যমে ব্যাংক কর্মকর্তা ইয়াসিন আরাফাতের নাম ভাঙ্গিয়ে নিয়েছে। একইভাবে ব্যাংকের সঙ্গে গ্রাহকত্ব থাকার পরও দাউদপুর বেলদী এলাকার ইউপি সদস্য হাসিবুর রহমানকে দায়মুক্তি সনদ দিয়েছে শাখাটি।

এভাবে দাউদপুরের নির্বাচনে ইউপি সদস্য প্রার্থী হওয়াদের মাঝে ইব্রাহিম , নয়ন, শফিকুল ইসলাম শফি, রোহিলা এলাকার বাচ্চু প্রতিজন এ ব্যাংক থেকে দায়মুক্তি সনদ নিতে একই পরিমাণ ঘুষ বিনিময় করতে বাধ্য হয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, ওই শাখায় চিহ্নিত দালালদের মাঝে পূর্বাচল শাখা ব্যাংক কর্মকর্তা ইয়াসিন আরাফাতের অধীনে রয়েছে দাউদপুরের বেলদী এলাকার রাকিব, কাজিরটেকের মনিরুজ্জামান মনু, হানকুর এলাকার সালাম, আগলা এলাকার রফিকুলসহ ১৫ জনের অধিকজন। একইভাবে , রূপগঞ্জ সদর ইউনিয়ন এলাকার তদন্ত কর্মকর্তা তানভীর হাসানের অধীনে রয়েছে রূপগঞ্জের বাগবের এলাকার সাইদুর, গোয়ালপাড়ার আবু সাইদসহ ১০ জনের অধিক দালাল চক্র।

ওই চক্রকে ম্যানেজ করলেই স্থানীয় গ্রাহকরা নির্ধারিত হারে ঘুষ বিনিময় করে পায় গ্রাহক সেবা। অন্যথায় ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হয় না তাদের।

এদিকে ০৬ ডিসেম্বর দুপুর ১টায় কৃষি ব্যাংক পূর্বাচল শাখায় এই প্রতিবেদক প্রবেশ করে দেখতে পান ,তানজিল নামের এক ব্যক্তি ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ নথি ঘেটে কর্মকর্তাদের চেয়ারে বসে কাজ করছেন। পরে তার পরিচয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি নৈশ প্রহরীর কাজে নিযুক্ত। ব্যাংকের লোকজন না থাকায় একটু সাহায্য করে থাকি।

এসব বিষয়ে অভিযুক্ত দাউদপুর ইউনিয়ন অঞ্চলের দায়িত্বে থাকা কৃষি ব্যাংক কর্মকর্তা ইয়াসিন আরাফাত মুঠোফোনে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, দালালরা কি করে না করে তার দায়ভার আমি নেব কেন। আমি কোন অনিয়ম করিনি। আবার দালাল হিসেবে চিহ্নিত বেলদী এলাকার রাকিব বলেন, ব্যাংকের কর্মকর্তারা অঘোষিত যা নিয়ম করেছে তা গ্রাহকরা দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে আমরা সহযোগীতা করি মাত্র। আমরা থাকাতে বহু লোকজন সুবিধা পাচ্ছে। অনেকেই কিভাবে লোন নিতে হয় তা জানে না। তাদের সহযোগীতা করলে তারা খুশি হয়ে যা দেয় তা নেই।

এ বিষয়ে কৃষি ব্যাংক ইছাপুরা পূর্বাচল শাখার ব্যবস্থাপক মিজানুর রহমান বলেন, আমি ২ মাস হয় যোগদান করেছি, ফলে সবকিছু জানা নেই। লোকবল সংকটের কারনে বিপুল পরিমাণ গ্রাহক সেবা দিতে একটু সমস্যা হয়। প্রতিটা শাখায় ৮জন থাকার নিয়ম থাকলেও এ শাখায় রয়েছে ৫জন। তাই হয়তো নৈশ প্রহরী সহযোগীতা করেছে এতে দোষের কিছু নেই। কর্মকর্তা ও দালালদের অনিয়ম বিষয়ে তিনি বলেন, গ্রাহকের সঙ্গে আতœীয় পরিচয়ে লোকজন যাতায়াত করে। এরা দালাল কি না জানা নেই। কোন কর্মকর্তা ঘুষ লেনাদেনায় জড়িত থাকলের গ্রাহকের অভিযোগ থাকলে তা আমলে নেব এবং গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করতে কাজ করবো।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here