মঙ্গলবার ১৮ জুন ২০২৪ ৪ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

বিশ্ববাজারে অর্ধেকে নেমেছে গমের দাম, কমেনি দেশে
প্রকাশ: বুধবার, ২১ জুন ২০২৩, ১২:১৫ অপরাহ্ণ

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে গমের দামে রেকর্ড গড়েছিল। সেটা বছরখানেক আগের কথা। জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় শস্যচুক্তির কল্যাণে এখন বিশ্ববাজারে গমের দাম নেমেছে অর্ধেকে। গত এক বছরের মধ্যে অস্থিতিশীল হয়নি বৈশ্বিক বাজার, টানা কমছে। তবে বিশ্ববাজারে গমের দাম কমলেও দেশে সেই হারে কমেনি আটা-ময়দার দাম। বরং উল্টো বেড়েছে। যার প্রভাব পড়ছে রপ্তানিতেও।

আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষক সংস্থা বিজনেস ইনসাইডারের তথ্য বলছে, গত বছর জুন মাসের মাঝামাঝি সময় আটা তৈরির গমের টনপ্রতি আমদানিমূল্য ছিল ৪শ ডলারের ওপরে, যা এবছর জুনে ২৫০ ডলারের নিচে। এ এক বছরের মাঝের সময় টানা কমেছে পণ্যটির দাম।

আন্তর্জাতিক বেশকিছু সংবাদ সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর দেশ দুটি থেকে গম আমদানি প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে গিয়েছিল। জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় শস্যচুক্তির কল্যাণে গত বছরের শেষে ইউক্রেন থেকে গম আমদানি শুরু হয়। তাতে বিশ্ববাজারে গমের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক থাকায়, আমদানি কমায় ও কৃষ্ণসাগর দিয়ে ইউক্রেনের খাদ্যশস্য সরবরাহ চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোয় বিশ্ববাজারে গমের দাম কমেছে।

তবে বিশ্ববাজারে এই নিম্নমুখিতার পরেও দেশে একই সময়ের ব্যবধানে খুচরা বাজারে আটার দাম বেড়েছে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) বলছে, গত বছর জুন মাসে প্যাকেটজাত এক কেজি আটার দাম ছিল ৪৮ টাকা, এখন তা ৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর ৬৩ টাকার প্যাকেট ময়দা বিক্রি হচ্ছে ৭৫ টাকা পর্যন্ত। একইভাবে খোলা আটা ও ময়দার দাম বেড়েছে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত।

দামের বিষয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বললে তারা বলছেন সেই গৎবাঁধা কথা। তাদের দাবি, আটা-ময়দার দাম বাড়ার জন্য কয়েকটি কারণ দায়ী। এক, কম দামের গম এখনো দেশে এসে পৌঁছায়নি। এছাড়া ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ও চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম।

দেশের অন্যতম শীর্ষ গম আমদানিকারক বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী বলেন, দাম কমলেও বর্তমান বাজারে যে পণ্য রয়েছে, সেই গম ৩৬০ ডলারে কেনা। এছাড়া আগে ৮৫-৮৬ টাকা ছিল ডলার রেট, আজ ১১৪ থেকে ১১৬ টাকা।

তিনি এ-ও বলেন, প্যাকেটজাত আটা-ময়দার দাম না কমলেও এ সময় গমের দাম প্রতি মণ ৪শ টাকা কমেছে, যা ১ হাজার ৮শ থেকে ১ হাজার ৪শ টাকা হয়েছে। এছাড়া গমের আমদানি চাহিদার তুলনায় অনেক কম। গমের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার কারণে দাম বাড়তি রয়ে গেছে।

এবছর গমের আমদানি কিছুটা কম, সে বিষয়টি অবশ্য সরকারের তথ্যও বলছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, চলতি অর্থবছরের ১৯ জুন পর্যন্ত (১১ মাস ১৯ দিন) গম আমদানি হয়েছে ৩৬ লাখ ৮৮ হাজার টন, যা গত বছরের একই সময় ছিল ৪০ লাখ ১২ হাজার টন।

তবে দেশে দ্বিতীয় এ প্রধান খাদ্যশস্য গমের উৎপাদন দিন দিন কমছে। দেশে বছরে গম উৎপাদন হয় ১১ লাখ টন। যেখানে চাহিদা প্রায় ৬০ লাখ টন। দেশের মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় ভাতের পরই সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় গমের তৈরি উপকরণ। এ কারণে গমের সরবরাহ কমে দাম বাড়লে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়ে।

সাত বছরে উৎপাদন কমেছে আড়াই লাখ টন
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সারাদেশে গত সাত বছরে গমের আবাদ কমেছে তিন লাখ একর জমিতে। এতে উৎপাদন কমেছে আড়াই লাখ টনেরও বেশি।

তথ্য বলছে, সারাদেশে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১০ লাখ ৯৯ হাজার একর জমিতে গমের আবাদ হয়েছিল। ওই বছর উৎপাদন হয়েছিল ১৩ লাখ ৪৮ হাজার টন, যা ক্রমান্বয়ে কমে গত অর্থবছর (২০২১-২২) এসে আবাদি জমির পরিমাণ আট লাখ দুই হাজার একরে ঠেকেছে। এসময় উৎপাদন নেমেছে ১০ লাখ ৮৫ হাজার টনে।

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছে, গমের জন্য দীর্ঘমেয়াদি শীতের প্রয়োজন হয়। এখন শীতের সময়কাল দিন দিন কমছে। বৈরী আবহাওয়ার কারণে গম চাষে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন কৃষক।

 

আটা-ময়দার দামের প্রভাব রপ্তানিতে
এবছর কৃষিপণ্য রপ্তানি কমে গেছে। যার একটি বড় কারণ হচ্ছে দেশের খাদ্য মূল্যস্ফীতি। অন্য রপ্তানিকারক দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে রপ্তানিযোগ্য খাদ্যপণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। কারণ, প্রক্রিয়াজাত পণ্যের কাঁচামালের দামও বেশি। যে কারণে আটা, ময়দা, তেল, চিনির মতো পণ্যগুলোর মাধ্যমে তৈরি হিমায়িত খাবারের খরচ বেড়েছে।

কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের মধ্যে বেশি রপ্তানি হয় রুটি, বিস্কুট ও চানাচুরজাতীয় শুকনা খাবারসহ বিভিন্ন কনফেকশনারি। শেষ ১১ মাসে এ ধরনের পণ্য উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো ২৩ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, যা গত বছর একই সময়ে ২৭ কোটি ডলার ছিল। এটা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ১৮ শতাংশ কম।

এ ধরনের প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য প্রস্তুতকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাগ্রো প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশন (বাপা)। সংগঠনটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. ইকতাদুল হক বলেন, স্নাক্সজাতীয় খাবারে আমরা এখন একদম পিছিয়ে গেছি। আমাদের দেশে আটা, ময়দা, তেল, চিনি, ডালডা এসবের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। আমাদের প্রতিযোগী ভারত-পাকিস্তানে এগুলোর দাম কম হওয়ায় তাদের খরচও কম। প্রতিযোগিতায় আমরা টিকতে পারছি না। বড় একটি অংশের অর্ডার হারাচ্ছি।

 







সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ