মঙ্গলবার ১৮ জুন ২০২৪ ৪ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

বঙ্গবন্ধু টানেলের ৯৭ শতাংশ কাজ শেষ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৩, ১০:৩৯ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রামে হাতছানি দিচ্ছে ‘ওয়ান সিটি টু টাউন’-এর স্বপ্ন। কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মাণাধীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল চালু হলে বাস্তবায়ন হবে এই পরিকল্পনা। ইতোমধ্যে টানেলের ৯৭ শতাংশ শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক মো. হারুনুর রশীদ। আর মাত্র তিন শতাংশ কাজ শেষ হলেই উদ্বোধন করা হবে। এপ্রিলের মধ্যে পুরোপুরি কাজ শেষ হবে বলে আশাবাদী সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, টানেল যোগাযোগ, পর্যটন ও অর্থনীতির গতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

গত বছরের ২৬ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেলের দক্ষিণ প্রান্তের একটি টিউবের পূর্তকাজের সমাপ্তি উদযাপন করা হয়েছে। এই উদযাপন অনুষ্ঠানে গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রকল্প পরিচালক মো. হারুনুর রশীদ বলেন, ‘টানেলের কাজ ৯৭ শতাংশ শেষ হয়েছে। চলছে শেষ মুহূর্তের কাজ। এখন টানেলে বড় ধরনের কাজ নেই। যানবাহন চলাচলের নিরাপত্তার খুঁটিনাটি বিষয় দেখা হচ্ছে। সব ঠিক থাকলে এপ্রিলের মধ্যে আমরা কাজ শেষ করতে পারব বলে আশা করছি। টানেল কবে উদ্বোধন করা হবে তা ঠিক করা হবে মন্ত্রণালয় থেকে।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল চালু হলে চীনের সাংহাই শহরের আদলে ওয়ান সিটি টু টাউন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন একধাপ এগিয়ে যাবে বলে উল্লেখ করেন প্রকল্প পরিচালক। তিনি বলেন, ‘টানেল চালু হলে চট্টগ্রাম নগরীর পরিধি বাড়বে। টানেলের এক প্রান্তে চট্টগ্রাম শহর। অপর প্রান্তে রয়েছে আনোয়ারা উপজেলা। শহরের খুব কাছে থাকলেও এ উপজেলা এতদিন অবহেলিত ছিল। টানেল নির্মাণের মধ্যে দিয়ে আরেকটি শহরে রূপ নিচ্ছে আনোয়ারা। ইতিমধ্যে আনোয়ারা উপজেলায় জমির দাম কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। আনোয়ারা উপজেলা প্রান্তে টানেল সংযোগ সড়কের দুই পাশে গড়ে উঠছে ছোট-বড় অসংখ্য শিল্প-কারখানা। টানেল চালু হলে কর্ণফুলী নদী পাড়ি দিতে সময় লাগবে মাত্র তিন মিনিট। টানেলকে ঘিরে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রাম নগরী এবং পর্যটন নগরী কক্সবাজারের সড়ক যোগাযোগে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।’

‘টানেল চালু হলে বছরে ৬৩ লাখ গাড়ি চলাচল করতে পারবে। সে হিসেবে দিনে চলতে পারবে ১৭ হাজার ২৬০টি গাড়ি। ২০২৫ সাল নাগাদ টানেল দিয়ে গড়ে প্রতিদিন ২৮ হাজার ৩০৫টি যানবাহন চলাচল করবে। যার মধ্যে অর্ধেক থাকবে পণ্যবাহী যানবাহন। ২০৩০ সাল নাগাদ প্রতিদিন গড়ে ৩৭ হাজার ৯৪৬টি এবং ২০৬৭ সাল নাগাদ ১ লাখ ৬২ হাজার যানবাহন চলাচলের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা আছে।’

‘টানেলের ভেতর দিয়ে মোটরসাইকেলসহ তিন চাকার গাড়ি চলাচল করতে পারবে না। টানেলের নিরাপত্তা তথা দুর্ঘটনা এড়াতে এসব ছোট যানবাহন চলাচল করতে দেওয়া হবে না। পাশাপাশি পায়ে হেঁটেও পাড় হওয়ার সুযোগ থাকবে না। তবে টানেল দিয়ে পণ্যবাহী যানবাহন চলাচলে উৎসাহিত করা হবে’

টানেল দিয়ে চলতে হলে কোন গাড়িকে কত টাকা টোল দিতে হবে তা চূড়ান্ত করা হয়েছে। এরমধ্যে প্রাইভেটকার গাড়িকে দিতে হবে ২০০, পিকআপ ২০০, মাইক্রোবাস ২৫০, বাস (৩১ আসনের কম) ৩০০, বাস (৩২ আসনের বেশি) ৪০০, বাস (৩ এক্সেল) ৫০০, এ ছাড়া ভারী যানবাহন ট্রাকের (৫ টন) টোল ৪০০, ট্রাক (৫ দশমিক ১ থেকে ৮ টন পর্যন্ত) ৫০০, ট্রাক (৮,০১ থেকে ১১ টন পর্যন্ত) ৮০০, ট্রেইলার (ফোর এক্সেল পর্যন্ত) ১০০০ এবং ফোর এক্সেলের অধিক ট্রেইলারের জন্য ১০০০ হাজার টাকার পাশাপাশি প্রতি এক্সেলের জন্য অতিরিক্ত ২০০ টাকা হারে টোল দিতে হবে।

টানেল প্রকল্পে রক্ষণাবেক্ষণ ও টোল আদায় করবে চীনা কোম্পানি। গত বছরের ১৮ মে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রীসভা কমিটির সভায় এ কাজের জন্য চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডকে নিয়োগের প্রস্তাব নীতিগতভাবে অনুমোদন দেওয়া হয়।

টানেল নির্মাণে মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার দিচ্ছে ৪ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। বাকি ৫ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা দিচ্ছে চীন সরকার। চীনের এক্সিম ব্যাংক ২ শতাংশ হারে ২০ বছর মেয়াদি এ ঋণ দিয়েছে। চীনের কমিউনিকেশন ও কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড (সিসিসিসি) টানেল নির্মাণের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। এদিকে গত ১৭ জানুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্প ব্যয় ৩১৫ কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা করা হয়। সময় বাড়িয়ে ২০২৩ সাল পর্যন্ত করা হয়েছে।

২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারিতে বঙ্গবন্ধু টানেলের নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

মূল টানেলের দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৩২ কিলোমিটার। তবে সংযোগ সড়কসহ টানেলের সর্বমোট দৈর্ঘ্য ৯ দশমিক ৩৯ কিলোমিটার। নদীর নিচে সুড়ঙ্গের মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে ১০ দশমিক ৮০ মিটার ব্যাসের দুটি টিউব। এর প্রতিটির দৈর্ঘ্য ২ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার। টানেলে টিউব দুটি থাকলেও সংযোগ পথ আছে তিনটি। এরমধ্যে একটি বিকল্প পথ হিসেবে প্রথম দুটির সঙ্গে যুক্ত থাকবে। দুই সুড়ঙ্গের মধ্যে প্রথম সংযোগ পথের দৈর্ঘ্য ১২ দশমিক ১৪ মিটার। দ্বিতীয় বা মধ্যবর্তী সংযোগ পথের দৈর্ঘ্য ১২ দশমিক ৩৪ মিটার। শেষটির দৈর্ঘ্য ১০ দশমিক ৭৪ মিটার। প্রতিটির ব্যাস গড়ে সাড়ে চার মিটার। কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে ১৮ থেকে ৩৬ মিটার গভীরতায় সুড়ঙ্গ তৈরি করা হয়েছে। নদীর মাঝ পয়েন্টে এই গভীরতা প্রায় ১৫০ ফুট। প্রতিটি ৩৫ ফুট প্রশস্থ ও ১৬ ফুট উচ্চতার। চট্টগ্রামে পতেঙ্গার নেভাল একাডেমি পান্থ থেকে শুরু হয়ে টানেলটি নদীর তলদেশ হয়ে চলে গেছে আনোয়ারার চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড এবং কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার লিমিটেড কারখানার মাঝামাঝি স্থানে।

 







সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ