রবিবার ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ১২ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

ঈদের অর্থনীতি চাঙা
প্রকাশ: বুধবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৩, ১১:৩৯ পূর্বাহ্ণ

অতিরিক্ত গরম ও বিভিন্ন মার্কেটে অগ্নিকাণ্ড সত্ত্বেও চাঙা হয়ে উঠেছে ঈদের বাজার। করোনাভাইরাসের প্রকোপ না থাকায় প্রায় তিন বছর পর এবার প্রাণ খুলে ঈদ উৎসব পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন সর্বস্তরের মানুষ। শবে বরাতের পর থেকে শুরু হয়েছে ঈদকেন্দ্রিক কেনাকাটা। ক্রেতাদের ভিড় বাড়তে শুরু করেছে মার্কেট, শপিংমল, ফ্যাশন হাউস এবং বিভিন্ন পণ্যের শোরুমগুলোতে।

ঈদকে সামনে রেখে সেজে উঠেছে রাজধানীসহ দেশের ছোট-বড় সব বিপণিবিতান ও শপিংমলগুলো। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী এখন কেনাকাটায় ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন। ফলে বাড়ছে ঈদের অর্থনীতির আকার। টাকার অঙ্কে যা প্রায় দুই লাখ কোটি টাকারও বেশি।

ছোট-বড় মার্কেট ও শপিং মলগুলোতে শবে বরাতের পর থেকেই ঈদের কেনাকাটা শুরু হয়ে গেছে (ছবি: ফোকাস বাংলা)
ইতোমধ্যে ঈদের এই বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়ছে। এক্ষেত্রে অর্থের বড় জোগান আসছে সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবীদের বোনাস। এই ঈদের বাজারে অর্থের যোগান দিচ্ছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। এক্ষেত্রে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা করতে ভূমিকা রাখছে মোবাইল ব্যাংকিং কার্যক্রম।

ঈদের অর্থনীতি নিয়ে সরকারিভাবে কোনও গবেষণা নেই। তবে বেসরকারি পর্যায়ে চালানো গবেষণার তথ্য অনুযায়ী ঈদ, রমজান ও বৈশাখী উৎসব ঘিরে অর্থনীতিতে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকার অতিরিক্ত লেনদেন হবে। এ টাকার বড় অংশই যাবে গ্রামে।

তবে ব্যবসায়ীদের অনেকে বলছেন, করোনা চলে যাওয়ার পর এবার ঈদের অর্থনীতি আশানুরূপ চাঙা হতে গিয়েও হচ্ছে না। তারা বলছেন, বিগত যে কোনও সময়ের এবার বেশি কেনাবেচা হবে এমন আশা করেছিলেন দোকানদাররা। কিন্তু রাজধানীর গুলিস্তানের বঙ্গবাজার, নিউ মার্কেটসহ কয়েকটি মার্কেটে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ব্যবসায়ীদের অনেকেই পথে বসে গেছেন। এছাড়া অতিরিক্ত গরম আবহাওয়ার কারণে অনেকে মার্কেটমুখী হচ্ছেন না। এতে করে এবারের ঈদের অর্থনীতিতে কিছুটা জৌলুস হারাচ্ছে।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির তথ্যমতে, ঈদে সারাদেশের ২৫ লাখ দোকানে কেনাকাটা হবে। মুদি থেকে শুরু করে এসব দোকানের মধ্যে কাপড়ের দোকান, শোরুম ও ফ্যাশন হাউসগুলোও রয়েছে। এসব দোকানে বছরের অন্য সময় গড়ে প্রতিদিন তিন হাজার কোটি টাকার পণ্য বিক্রি হলেও রোজার মাসে সেটি তিনগুণ বেড়ে হয় ৯ হাজার কোটি টাকা। ওই হিসাবে রোজার এক মাসে এই ২৫ লাখ দোকানে ঈদ পোশাক থেকে শুরু করে ভোগ্যপণ্য বিক্রি হবে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকারও বেশি। ঈদুল ফিতরে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয় পোশাকের বাজারে। পোশাকের দোকানেই ঈদের কেনাকাটা এবার ৮০ হাজার থেকে এক লাখ কোটি কোটি টাকার বেশি।

অভ্যন্তরীণ পোশাকের সবচেয়ে বড় জোগান আসে পুরান ঢাকার উর্দু রোডের পোশাক মার্কেট থেকে। ঢাকার বিভিন্ন মার্কেটসহ দেশের বিভাগ ও জেলা-উপজেলা পর্যায়ের মার্কেটগুলোতে দেশি পোশাক সরবরাহ হয় পুরান ঢাকার এই মোকাম থেকে। এর বাইরে ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড এবং চীন থেকেও প্রচুর তৈরি পোশাক আমদানি করা হয়।

তবে এবার নববর্ষ আর ঈদ একাকার হয়ে ঈদের অর্থনীতির আকার কিছুটা বড় হয়ে উঠেছে। অন্য বছর পহেলা বৈশাখকে সামনে রেখে বা পহেলা বৈশাখকে ঘিরে যে বেচাকেনা হয় এবার ঈদের কেনাকাটাও যোগ হয়েছে তার সঙ্গে ৷

অন্যান্য বছরের মতো এবারও ঈদের ঠিক আগে আগে ব্যবসা পুরোদমে জমে উঠবে বলে জানান ব্যবসায়ীরা

বরাবরের মতো এ বছরও সাড়ে ১২ লাখ সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী অষ্টম বেতন কাঠামোর আলোকে ঈদ বোনাস পাচ্ছেন। এর মধ্যে রয়েছে তিন বাহিনী, পুলিশ, বিজিবি, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মকর্তা ও কর্মচারী। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও নিজস্ব কাঠামোতে বোনাস দিচ্ছে। এছাড়া পোশাক ও বস্ত্র খাতের প্রায় ৭০ লাখ কর্মীও বোনাস পাচ্ছেন। যার পুরোটাই যোগ হচ্ছে ঈদ অর্থনীতিতে।

ঈদ উৎসব অর্থনীতিতে সারা দেশের দোকান কর্মচারীদের বোনাসও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির হিসাবে দেশে ২০ লাখ দোকান, শপিংমল, বাণিজ্য বিতান রয়েছে। গড়ে একটি দোকানে তিন জন করে ৬০ লাখ জনবল কাজ করছে। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির হিসাবে একজন কর্মীকে পাঁচ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বোনাস দেওয়া হয়। ওই হিসাবে গড়ে বোনাস আট হাজার টাকা ধরে চার হাজার ৮০০ কোটি টাকা বোনাস পাচ্ছে এ খাতের শ্রমিকরা যা পুরোটাই ঈদ উৎসব অর্থনীতিতে যোগ হচ্ছে।

শহরে কেনাকটা বেশি হলেও ঈদের সময় তরল টাকার বড় অংশই যাবে গ্রামে, ঈদের কেনাকানার এই ছবি রাজধানীর আজিজ সুপার মার্কেটের|

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর হিসাবে প্রতি বছর জাকাত ও ফিতরা বাবদ খরচ হচ্ছে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা। এই টাকার সিংহভাগই যাচ্ছে গ্রামে। এছাড়া রোজা ও ঈদে নানা কর্মসূচিতে শহরের চাকরিজীবীরা গ্রামে যাচ্ছেন। সেখানে তারা অর্থ ব্যয় করছেন। যে কারণে টাকার প্রবাহ বাড়ছে। এছাড়া গ্রামের দরিদ্র মানুষের সহায়তায় শহরের লোকজন সাধ্য অনুযায়ী অর্থের জোগান দিচ্ছেন।

এ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ঈদ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আর ব্যবসায়ীরা সারা বছর এই সময়ের জন্য মুখিয়ে থাকেন। ঈদকে ঘিরে ব্যবসায়ীরা নতুন নতুন বিনিয়োগ করেন। করোনার কারণে বিধিনিষেধের মুখে গত তিন বছর ব্যবসায়ীরা সেভাবে মুনাফা করতে না পারলেও এবার তারা ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন বলে আশা করছি।

তবে ভিন্ন কথা বলছেন বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি এবং এফবিসিআইর সাবেক সহ-সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন। তিনি বলেন, এবার ঈদে ব্যবসায়ীরা বিপদে আছে। তিনি বলেন, সাধারণত পহেলা বৈশাখকে ঘিরে চার হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হয়। কিন্তু এবার রোজার মাসে পহেলা বৈশাখ, আবার সামনেই ঈদ, ফলে দুইটি উৎসব এক হয়ে গেছে। আর দ্রব্যমূল্য অনেক বেশি হওয়ায় মানুষ আগের চেয়ে কম কিনছেন। বাজেট কাটছাঁট করছেন।

তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে ঈদুল ফিতরে সাধারণভাবে এক লাখ ৭০-৮০ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। হেলাল উদ্দিন বলেন, এবার ঈদে এই পরিমাণ লেনদেন না-ও হতে পারে। কারণ, মানুষের খাবার কিনতেই আয়ের প্রায় পুরোটা শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে সবাই যে ঈদের পোশাক কিনতে পারবেন, তা বলা যায় না। সবাই কম খরচ করতে চাইছেন।

মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, জাকাত ও ফিতরার প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা, তৈরি পোশাকের ৩৫ হাজার কোটি, ভোগ্যপণ্যের বাজার ২৫ হাজার কোটি এবং ঈদ বোনাস, পরিবহন ও অন্যান্য মিলিয়ে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা এবং আনুষঙ্গিক অন্যান্য খাতে ৫০ হাজার কোটি টাকা সরাসরি ঈদকেন্দ্রিক লেনদেন হয়। এ ছাড়াও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ২৭ হাজার কোটি টাকার কিছু অংশ ঈদকেন্দ্রিক লেনদেন হয়ে থাকে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বিগত বছরের মতো এবারও ভোগবিলাস খাতেই বেশিরভাগ টাকা যাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ঈদের মতো উৎসব এলেই বাড়তি টাকার প্রবাহ গতিশীল হয়। এতে সচল হয়ে উঠে গ্রামের অর্থনীতি। এ সময় নিম্ন আয়ের মানুষের হাতেও টাকা যায়। এতে তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে। এটি অর্থনীতির ইতিবাচক দিক।

এদিকে ঈদ ঘিরে সব ধরনের নিত্যপণ্যের চাহিদা এরই মধ্যে কয়েকগুণ বেড়েছে। বিশেষ করে ভোজ্যতেল, মাংস, চিনি, ডাল, সেমাই এবং পেঁয়াজের চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে ঊর্ধ্বমুখী।

এদিকে আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে এটিই শেষ রোজার ঈদ হওয়ায় রাজনৈতিক নেতাদের সাহায্য-সহযোগিতা ও দানের তৎপরতা বাড়ায় ঈদ অর্থনীতিতে এর জোরাল প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য গরিব, দুস্থ, এতিমদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন তারা।

এদিকে বাড়তি খরচের জন্য প্রবাসীরা তাদের স্বজনদের কাছে অতিরিক্ত অর্থ পাঠাচ্ছেন। এর বড় অংশই যাচ্ছে গ্রামে। রোজার শুরু থেকেই বে‌শি বে‌শি রেমিট্যান্স পাঠা‌চ্ছেন প্রবাসী বাংলা‌দে‌শিরা। চলতি এপ্রিল মাসের ১৪ তারিখ পর্যন্ত বৈধ বা ব্যাংকিং চ্যানেলে ৯৫ কোটি ৮৭ লাখ মার্কিন ডলার সমপরিমাণ অর্থ দেশে এসেছে। দেশীয় মুদ্রায় (প্র‌তি ডলার ১০৭ টাকা ধ‌রে) যার পরিমাণ ১০ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা। এছাড়া মার্চ মাসে ২০২ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা।

 







সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ