“ঘরে থাকলে না খেয়ে মরব, বাহিরে গেলে করোনায় মরব”

0
87

লিখন আহম্মেদ : “সরকার তো লকডাউন ঘোষনা দিয়েই শেষ। ঘরে ঘরে চাল, ডাল, তেল, মাছ, লবন প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌছে দেক, আর ঘর থেকে বাহির হমু না। ঘরে থাকলে না খেয়ে মরমু, বাহিরে গেলে করোণার মরমু। এখন আমরা কি করমু। কাম কাজ না করলে বউ পোলাপান লইয়্যা খামু কি। রাস্তায়ও লোকজন নাই আয় রোজগার তেমন নাই। কোনো বড় লোকে নেতারা তো এ বিপদে আগাইয়্যা আইলো না। একমাত্র আল্লাহ ই আমাদের ভরসা” এমনি করে আক্ষেপ করে কথাগুলো বলছিলেন অটোরিক্সা চালক রাসেল। কাজ নেই, আয়-রোজগার নেই। খরচ আছে। যারা দিন আনে, দিন খায়; কাজ না করলে একদিনও চলে না, তারা এখন দিশেহারা। করোনাভাইরাস মোকাবিলায় জনসমাগম বন্ধে পুলিশের কড়া পাহারা চলছে রূপগঞ্জের সর্বত্র। ফলে বেকার হয়ে পড়েছে স্বল্প আয়ের অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষ। হাত গুটিয়ে বসে আছে তারা।

এ পরিস্থিতিতে পেটে ভাত জোগাতে হিমশিম খাচ্ছে প্রতিনিয়ত। রূপগঞ্জে করোনাভাইরাস আতঙ্কের কারণে নিম্ন আয়ের মানুষ বিপাকে পড়েছেন। রিকশা, ভ্যান, অটোরিকশা চালানো ও দিনমজুরিসহ বিভিন্ন কাজকর্ম করে নিম্ন আয়ের মানুষকে সংসার চালাতে হয়। কিন্তু কয়েক দিন ধরে মানুষের চলাচল কমে যাওয়ায় তাদের আয়-রোজগার কম হচ্ছে। খেটে খাওয়া মানুষরা সারাদিন রিকশা, ভ্যান ও অটোরিকশা চালিয়ে যা রোজগার করেন তা দিয়ে তাদের সংসার চালানোও কষ্টকর হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ নিম্ন আয়ের মানুষ বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে অটোরিকশা, ভ্যান ও রিকশা ক্রয় করেছেন। তারা প্রতিদিন রিকশা-ভ্যান চালিয়ে সংসার চালান ও সাপ্তাহিক ঋণের কিস্তির টাকা পরিশোধ করেন।

উপজেলার দক্ষিণবাগ গ্রামের রিকশাচালক আলী জানান, গত বছর লকডাউনের সময় কত মানুষের কাছে ধার চাইলাম দিল না। অবশেষে পেটের দায়ে কিস্তি নিলাম। ধারদেনা ওঠে গেছে, কিস্তিই এখন ভরসা। প্রতিদিন রিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন ও সপ্তাহে ৬৫০ টাকা এনজিওর ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতেন তিনি। কিন্তু কয়েক দিন ধরে করোনাভাইরাসের কারণে লোকজন চলাচল কম করায় যে টাকা রোজগার হয় তা দিয়ে সংসার চালানোই কষ্টকর হয়ে পড়েছে। করোনাভাইরাসের কারণে কেউ টাকাও ধার দিচ্ছে না। নগরপাড়া বাজারের বিজয় ফার্মেসীর মালিক বিজয় সরকার বলেন, ফার্মেসী খোলা রাখতে বলেছেন প্রশাসন। কিন্তু অর্ডার দিলে ওষুধ আসে না। এভাবে আর চলতে পারে না। ওষুধের দোকানও তো বন্ধ হয়ে যাবে।

করোনার প্রভাব পড়েছে খেটে খাওয়া মানুষের উপরও। করোনায় সড়কে মানুষের আনোগোনা কমে গেছে, নেই ফুটপাত কিংবা মার্কেটগুলোতে ব্যস্ততা। দিন এনে দিন খান এমন লোকজন পড়েছে বেকায়দায়। দিনে আয় হতো ২০০ থেকে ৫০০টাকা এমন মানুষের এখন খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকাই দায়। তবে এটুকুও তারা বুঝতে পারছেন বেঁচে থাকতে হলে সতর্কতারও কোন বিকল্প নেই। উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, এইতো কয়েকদিন আগে যেসময়টা তারা কর্ম ব্যস্ততার মধ্যে সময় পার করতে হতো। এখন সেই সময়টাতে তারা অলস সময় পার করছে। বিশেষ কাজ ছাড়া বাসা থেকে বের হতে বারণ থাকলেও পেটের দায়ে তা মানার সুযোগ নেই। সিএনজি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন উপজেলার ছনেরটেকের কবির মিয়া। তিনি জানান, ভাই আগের মত রাস্তায় তেমন যাত্রী নাই। অনেকক্ষণ বসে আছি কোন যাত্রী পাই না। তাই বন্ধুর সাথে বসে বসে আড্ডা দিতাছি। অটোচালক মনির বলেন, সারা দিনে ভাই ১২০ টাকা কামাইছি, মালিক’রেই কি দিমু, আর আমিই বউ পোলাপান লইয়া কি খামু ! করোনায় আমাদের রিজিক খাইয়ালাইছে। চনপাড়া বটতলা মোড়ে কাজ না থাকায় এক ভ্যানচালক ভ্যানে উপর শুয়ে ঘুমাচ্ছে তার পাশেই একজন ব্যবসায়ী মোবাইলে ওপর প্রান্তে কথা বলছে, করোনার কারণে ব্যবসায় মন্দা অবস্থা আছে, কয়েক সপ্তাহে পরে বুঝা যাইবো, অহন কিছু বুঝা যাচ্ছে না। বেয়াকায়দায় আছে ব্যবসা। চনপাড়া পুর্নবাসন এলাকার ফুল মিয়া বলেন, গতকাল আধা (অর্ধ) বেলা পর্যন্ত ২০০ টাকা পাইছি যেখানে আগে দিনে ৫০০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা কামাইতে পারতাম। আইজ দুপুরে বের হইছি ১৫০ টাকা কামাইছি আপনারে আধা ঘন্টা পর পাইছি। এমনেতই স্কুল-কলেজ-কোচিং বন্ধ করা হয়েছে। তাই আগের মত যাত্রী পাই না।

এর কম কয় দিন থাকে কে কে জানে। উপজেলার বশুলিয়া গ্রামের দিলীপ চন্দ্র জানান, তিনি প্রতিদিন ভ্যান চালিয়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা আয় করেন। এ টাকা দিয়ে সংসার ও প্রতি সপ্তাহে সাড়ে ৭০০ টাকা এনজিওর কিস্তি চালান। কিন্তু কয়েক দিন ধরে করোনাভাইরাসের কারণে এলাকার মানুষ মালপত্র হাট-বাজারে আনা-নেওয়া করছেন কম। এ কারণে আয়-রোজগার একেবারে কমে গেছে। তিনি বলেন, সারাদিন রিকশা চালিয়ে যে টাকা কামাই হয় সে টাকা দিয়ে সংসারই চলছে না। নগরপাড়া বাজারের গ্রামের চায়ের দোকানি রিয়াজ হোসেন জানান, এনজিও থেকে ঋণ তুলে চায়ের দোকান করেন তিনি। সারা দিনের চেয়ে দোকানে সন্ধ্যার পর লোকজন হয় বেশি। ওই সময় দোকানে চা বিক্রি হয় বেশি। কিন্তু লকডাউনের কারণে সন্ধ্যার পর থেকে চায়ের দোকান বন্ধ রাখার জন্য বলা হয়েছে। কিন্তু দিনে যা বিক্রি হচ্ছে, সে টাকা দিয়ে সংসার চালোনোই কষ্ট।

রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ নুশরাত জাহান বলেন, প্রশাসন থেকে এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় দুর্যোগে একটু কষ্টতো হবেই। সবাইকে ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। এ বিপদের দিনে ধনীদের সাধ্যমত গরীব অসহায়দের পাশে দাঁড়াতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here