মাতৃভাষা বনাম রাষ্ট্রভাষা : এ্যাডঃ তৈমূর আলম খন্দকার

0
182

পবিত্র কোরানশরীফের মর্মমতে সৃষ্টি কর্তা আল্লাহপাক মানুষকে কথা বলতে শিখিয়েছেন (সূত্র: সূরা আর-রহমান) এবং কথা বলার প্রধান মাধ্যম হলো ভাষা। জাতিসংঙ্গ “ইশারা” ভাষাকে ভাষার একটি ধরন হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে বটে, কিন্তু ভাষা ছাড়া শুধুমাত্র ইশারার মাধ্যমে মনের ভাব সঠিকভাবে প্রকাশ করা যায় না। যে মানুষটির কন্ঠে ভাষা নেই সে বুঝতে পারে পৃথিবীটা তার জন্য কতটুকু বোঝা। যে পরিবারে একজন বধির বা বোবা জন্ম গ্রহণ করে তখন সে পরিবারটি পৃথিবীর যে একটি “অন্ধকার” চিত্র আছে তা উপলব্দি করে বুঝতে পারে যে, পৃথিবীটা কতটুকু নিষ্ঠুর। ফলে “ভাষা” পৃথিবীর মধ্যে সৃষ্টিকর্তার সবচেয়ে মূল্যবান উপহার। এ মূল্যবান উপহারের মধ্যে আরো মূল্যবান হলো “মাতৃভাষা”।

 

বাঙ্গালী তাদের মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় মর্যাদামান করতে যে আন্দোলন সংগ্রাম তথা পাকিস্তান সরকারের বুলেটে রক্ত ঝড়াইয়াছে। পৃথিবীতে মাতৃভাষার জন্য গুটিকয়েক জাতিপ্রাণ দিয়েছে তার মধ্যে বাঙ্গালী অন্যতম। পাশ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলির মধ্যে একমাত্র আসামে মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠার জন্য রক্ত দিতে হয়েছে। বাঙ্গালী জাতিকেও স্বাধীনতার জন্য রক্ত দিতে হয়েছে। এ জাতির যা কিছু অর্জন হয়েছে তা হয়েছে রক্তের বিনিময়ে। পৃথিবীর মধ্যে অনেক কম জাতিই আছে যারা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে নিজ মাতৃভূমিকে স্বাধীন করেছে। এ কারণেই বাঙ্গালী জাতি যুদ্ধের মাধ্যমে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার গৌরব অর্জন করে। তবে দেশ স্বাধীনতার বীজ লুকাইত ছিল মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষায় পরিনত করার আন্দোলনের মধ্যে। ১৯৪৭ ইং সনে পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ায় বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবীতে পাকিস্তানীদের মূখা মূখী দাড়ানোই ছিল বাঙ্গালীর প্রথম প্রতিবাদ যা পর্যায়ক্রমে স্বাধীকার, পরে স্বায়ত্বশাসন আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধে পরিনত হয়। ফলে ভাষা আন্দোলন বাঙ্গালীকে পৃথিবীতে মাথা উচু করেছে, ফলশ্রুতিতে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে জাতিসংঙ্গ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ভাষা আন্দোলনে যারা অংশগ্রহণ করার সূযোগ পেয়েছেন তারা বলেছেন যে, “একুশ মানে মাথা নত না করা।” এ প্রবাদটি এতো জনপ্রিয়তা পেয়েছে যা এখনো বেদবাক্য হিসাবে ব্যবহ্নত হচ্ছে। এ নিয়ে অনেক কবিতা, প্রবন্ধ রচিত হয়েছে, ছাপা হচ্ছে মনমুগ্ধকর পোষ্টার ও দেয়াল লিখন। প্রতি বৎসর ২১শে ফেব্রুয়ারি বাঙ্গালী জাতি বাংলাদেশেতো বটেই, বহির বিশ্বেও যেখানে বাঙ্গালী আছে সেখানে মাতৃভাষা দিবস হিসাবে পালন করে তৎসময়ের ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধার সাথে স্বারণ করছে। কিন্তু বাঙ্গালীর প্রিয় মাতৃভাষা “বাংলা” কি রাষ্ট্রভাষা হিসাবে প্রয়োগ হচ্ছে? সংবিধানের প্রথম ভাগের ৩য় অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, “প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা।

 

” কাগজে কলমে রাষ্ট্রীয় ভাবে সংবিধানে “বাংলা” রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে বটে কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে সর্বক্ষেত্রে বাংলা ভাষা কি ব্যবহ্নত হচ্ছে? রাষ্ট্রের বিভিন্ন অফিস/আদালতে এখনো ইংরেজী ভাষাকে মর্যাদা আসনে বসানো হচ্ছে। আদালতসহ রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন দপ্তরে ইংরেজীকে প্রাধান্য দিচ্ছে। ইংরেজী যে না জানে তার জীবনটাই যেন ব্যর্থতার পর্যাবেশিত হওয়ার মানসিকতা এখনো আমাদের সমাজে বিদ্যমান। তবে “ইংরেজী” যেহেতু আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি প্রাপ্ত সেহেতু ইংরেজী ভাষায় পারদর্শী থাকার অনেক গুরুত্ব রয়েছে বটে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় দপ্তরে ইংরেজী ব্যবহার এবং ইংরেজী ভাষায় পারদর্শী থাকা এক কথা নয়। স্পষ্টভাবেই বলতে চাই যে, আন্তর্জাতিক ভাবধারা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য ইংরেজী ভাষায় পারদর্শী থাকা অবশ্যই বাঞ্চনীয়, তবে দেশের অভ্যন্তরীন প্রশাসনিক ব্যবস্থার সর্বক্ষেত্রে ইংরেজী ভাষার প্রাধান্য যথাযথ নহে। বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটী কর্তৃক প্রকাশিত ও সিরাজুল ইসলাম সম্মাদিত বাংলাদেশের ইতিহাসে (১৭০৪-১৯৭১) “রাষ্ট্র ও শিক্ষা” প্রবন্ধে (পৃষ্ঠা: ৭৯) দেখা যায় যে, “বৃটিশ সরকারের আর্থিক অনুদানে মাদ্রাসা ও সংস্কৃতি কলেজ পরিচালিত হয়েছে। ওয়ারেন হোষ্টিংসের অনুকূলে ১৭৮১ ইং সনে কলকাতা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৭৯২ ইং সনে জোনাথন ডানকান প্রতিষ্ঠা করেন সংস্কৃতি কলেজ। ১৮৩৫ সালে লর্ড বেন্টিঙ্ক মেকলের ভারত উপ-মহাদেশে ইংরেজী ভাষার মাধ্যমে জ্ঞান-বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রসারকে ভারত সরকারের শিক্ষানীতির উদ্দেশ্য বলে গ্রহণ করেন। তৎকালিন সরকারী নীতির এ পরিবর্তনের ফলে ক্রমে বাংলায় বেশ কিছু সরকার পরিচালিত সরকারী অনুদান প্রাপ্ত ইংরেজী স্কুল ও কলেজ গড়ে উঠে। এসব প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা প্রধানত: বাংলায় উচ্চ-ভিলাষী পরিবারের অর্ন্তরভুক্ত ছিল। তখনই সরকারী চাকুরীতে ইংরেজী শিক্ষিতদের অগ্রাধিকার প্রদানের নীতি পরবর্তীত হয়।”

 

প্রক্ষাত লেখক বদরুদ্দীন উমর তার লেখা “ভাষা আন্দোলন” প্রবন্ধে লিখেছেন যে, “শুধু সাংস্কৃতিক মহলই নয়, রাজনৈতিক মহলেও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগে ভাষা বিষয়ক কিছু উল্লেখযোগ্য চিন্তাভাবনা ছিল। ১৯৪৪ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের তদানীন্তন সাধারণ সম্পদক আবুল হাশিম প্রাদেশিক কাউন্সিলের সামনে পেশ করার জন্য যে খসড়া ম্যানিফেস্টো প্রণয়ন করেছিলেন, তাতে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে উল্লেখ করা হয়েছিল। ১৯৪৭ সালের ৩ জুন ব্রিটিশ ভারতের সর্বশেষ গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটেন কর্তৃক ভারতবিভাগ সম্পর্কিত রোয়েদাদ ঘোষণার পর মুসলিম লীগের অল্পসংখক বামপন্থী কর্মীর উদ্যেগে জুলাই মাসে ঢাকায় গণআজাদী লীগ নামে একটি রাজনৈতিক গ্রুপ গঠিত হয়। কামরুদ্দীন আহমদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, তাজউদ্দীন আহমদ, অলি আহাদ প্রভৃতি নেতৃস্থানীয় কর্মীর দ্বারা একটি কমিটি গঠিত হয়। এ গ্রুপ আশু দাবি কর্মসূচি আদর্শ নামে যে ম্যানিফোস্টা প্রকাশ করে তাতে বলা হয়: মাতৃভাষার সাহায্যে শিক্ষাদান করিতে হইবে। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা।

 

এই ভাষাকে দেশে যথোপযোগী করিবার জন্য সর্বপ্রকার ব্যবস্থা করিতে হইবে।” এতে প্রতিয়মান হয় যে, পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পূর্ব থেকেই বাঙ্গালী জাতি বাংলা ভাষার প্রয়োগের দাবীতে স্বোচ্চার ছিল। বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাবে প্রয়োগ করার দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানগতভাবে বাংলা একাডেমীর উপর বর্তায়। কিন্তুবাংলা একাডেমী সে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। বাংলা একাডেমী এখন সরকারী দলের একটি অংগ সংগঠন হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছে। সরকারী অফিস আদালতে ব্যবহার করার জন্য বাংলা ভাষায় ব্যবহার করার জন্য ভাষার প্রয়োগ সাবলীল করার পদক্ষেপ নেয়ার দায়িত্ব বাংলা একাডেমীর উপর। কিন্তু গবেষনামূলক কার্যক্রম থেকে বাংলা একাডেমী সরে গিয়ে সরকারের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। প্রতিবৎসর কয়েক দফা পদক বিতরণ করাই একাডেমীর মূখ্য কর্ম। কিন্তু পদক বিতরনে একাডেমী নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন না করে শুধুমাত্র সরকারী ঘরনার লোকদেরকেই পদক প্রাপ্তী সহায়ক ভূমিকা পালন করে। একটি রাষ্ট্রে এমন কিছু প্রতিষ্ঠান থাকা দরকার যাহাতে দল মত নির্বিশেষে সকল মতের মানুষ একত্রিত হয়ে তাদের মধ্যে মত বিনিময়ের মাধ্যমে জাতির প্রতি অবদান রাখতে পারে। বাংলা একাডেমী সে ধরনের একটি প্রতিষ্ঠান হতে পারতো; কিন্তু এর পরিবর্তে একাডেমী সরকারী দলের পদলহনে প্রতিযোগীতায় নেমেছে। সরকারী বিরোধী ঘরনার লেখকদের বই বাংলা একাডেমী প্রকাশ করে না। গবেষনায় রয়েছে তাদের পক্ষপাতিত্ব। ইতিহাস সৃষ্টিতে রয়েছে সত্য মিথ্যার দোলাচল; যে ইতিহাস রচনা করলে ক্ষমতাসীনরা খুশী থাকবে, সে ইতিহাসই বাংলা একাডেমীর গবেষনার ফল। সবচেয়ে বড় কথা এই যে, একাডেমীর অনেক জীবন ও সাধারণ সদস্য রয়েছে। সদস্যদের মধ্যে দলমত নির্বিশেষে অনেকেই সদস্য রয়েছেন, যারা সরকারী ঘরনার বা সরকারী সমর্থক সদস্য নহে তাদের নূন্যতম গ্রহণযোগ্যতা বাংলা একাডেমীর নিকট নাই। সরকার দাবী করে দেশে গণতন্ত্র বিদ্যমান।

 

অথচ বাংলা একাডেমী চলছে একটি অনির্বাচিত কমিটি দ্বারা। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলা একাডেমী কোন নির্বাচিত কমিটি দ্বারা পরিচালিত হয় নাই। সরকার দেশের সংস্কৃতিকে নিজেদের মতো করে নিয়ন্ত্রন করার উদ্দেশ্যেই বাংলা একাডেমীকে সরকারী ঘরনার অনির্বাচিত ব্যক্তিদের দ্বারা পরিচালিত করছে।

 

মাতৃভাষা কোন সরকারের সম্পদ নহে। ইহা একটি জাতিয় ঐতিহ্য ও সম্পদ। এ সম্পদকে জাতীয় ভাবেই রক্ষা করতে হবে। সর্বক্ষেত্রে ভাষা প্রয়োগের মাধ্যমেই ইহা সম্প্রসারিত হবে। সরকার প্রাথমিক শিক্ষার উপর গুরুত্ব দিয়েছে বটে, কিন্তু এখন পর্যন্ত দেশের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নিরক্ষর। স্বাধীনতা উত্তর নিরক্ষরতা দূরীকরণের জন্য সরকারী যে উদ্দেগ ছিল তাহাও থেমে গেছে। দেশ স্বাধীনতার পর সরকারী উদ্দ্যেশেই কয়েকবার নিরক্ষরতা দূরীকরণে উদ্দেগ নেয়া হলেও আমলাতান্ত্রিক অসহযোগীতার জন্য সফল হতে পারে নাই। পরবর্তী স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে (কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র) নিরক্ষরতা দূরীকরণ অর্থাৎ ধনীগরীব নির্বিশেষে নিরক্ষয় ব্যক্তিদের অক্ষর জ্ঞান দেয়ার উদ্দ্যোগ নেয়া হলেও পরে সে উদ্দ্যোগও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে অপমৃত্যু হয়।

 

সমগ্র জাতিকে ভাষার সাথে পরিচিত করতে হলে অক্ষর জ্ঞান শিক্ষানো প্রয়োজন যা প্রতিষ্ঠানিক কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দ্বারা সম্ভব নয়; দায়িত্ব নিতে হবে গোটা শিক্ষিত সমাজকে। দেশে বস্তিবাসী গরীব মেহনতী মানুষ যাদের “নুন আনতে পানতা ফুরায়” তাদের পক্ষে কোন স্কুলে ভর্তি হওয়া যেমন সম্ভব নয় এবং অভাবের তাড়নায় বস্তিতে বেয়ে উঠা তাদের সন্তানদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠানোর পরিবর্তে কর্মস্থলে প্রেরণ করাটাই মেহনতী খেটে খাওয়া মানুষ জরুরী মনে করে। ভাষা শিক্ষার জন্য অক্ষর জ্ঞান এবং অক্ষর জ্ঞান সর্বস্তরে পরিচিত করার জন্য সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য সরকারকে আরো উদ্দ্যোগী ও সুদূর প্রসারী টেকসই কর্মসূচী গ্রহণ করতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here