প্রশিক্ষক সংকটে প্রশিক্ষণ বঞ্চিত রূপগঞ্জের হাজারো যুবক

0
38

মাহবুব আলম প্রিয়ঃ দেশের বেকার সমস্যা দূরীকরণে সরকারের নানা পদক্ষেপের অন্যতম যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের অধীনে প্রশিক্ষণ ও ঋণ প্রদান কার্য্যক্রম। এতে বেকারদেরকে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে রূপান্তর করে সাবলম্বি করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে সরকার। কিন্তু নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে যুব উন্নয়ন কার্যালয় থেকে যুব উন্নয়নের ছকে থাকা ৪৪ টি বিষয়ের মধ্যে কেবল ১৪ বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান কার্যক্রম দেখা গেছে। বাকি বিষয়ে দক্ষ প্রশিক্ষক না থাকায় প্রশিক্ষণ বঞ্চিত হচ্ছে স্থানীয় যুবকরা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, রূপগঞ্জ উপজেলা যুব উন্নয়ন কার্যালয় থেকে কাঙ্খিত প্রশিক্ষণ নিতে পারছে না স্থানীয় যুবকরা। তবে ২০১৯-২০ অর্থ বছরে ৭৩ জনকে প্রশিক্ষণ দিয়ে ঋণের আঁওতায় দেখালেও তাদের মাঝে মাত্র ১৬জন এ উপজেলা থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। বিধি অনুযায়ী বেকারত্ব দূরীকরণের লক্ষ্যে ১৮ থেকে ৩৫ বছরের যে কোন বেকার যুবক এ বিভাগ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে সরকারীভাবে ঋণ পাওয়ার কথা। কিন্ত যুব উন্নয়নের প্রশিক্ষণ সনদ থাকলেই ঋন পায় না প্রশিক্ষণ প্রাপ্তরা। তাদের ব্যাংকের জামানতের মতোই জমা দিতে হয় ঘর বাড়ির মুল দলিল। আবার নিরাপত্তাজণিত জামিনদার হিসেবে রাখতে হয় বিত্তশালী প্রতিষ্ঠিত কাউকে। থাকতে হয় প্রতিষ্ঠিত ফার্ম ও চাকুরীজীবি। আর এভাবে জেলা থেকে কতিপয় দরিদ্র ও সাধারন যুবকরা প্রশিক্ষণ নিয়ে সনদ পেলেও ঋণ পাওয়াকে জটিল ভেবে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছেন তারা। তাদের দাবী ৬০ হাজার টাকা ঋণ পেতে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা বিভিন্নভাবে খরচ হয়ে যায়।

সূত্র জানায়, সরকারীভাবে প্রশিক্ষণ প্রাপ্তদের ৪০ থেকে ৬০ হাজার টাকা সহজ শর্তে ঋণ দেয়া হয়। তা পেতে মাত্র ৫% হারে সুদসহ মুল টাকা মাসিক কিস্তিতে ১ বছরে ফেরত দিতে হয়। কিন্তু এ ঋণ পেতে হয়রানীর শিকার হচ্ছে স্থানীয় যুবকদের। সাধারনত ১৮ থেকে ৩৫ বছরের বেশিরভাগ যুবকের নামে কোন ঘর বাড়ি থাকে না। তবু তাদের কাছে চাওয়া হয় এসব সম্পদের মুল কাগজ।

এ বিষয়ে রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ নুসরাত জাহান বলেন, করোনা মহামারীর সময় সাধারনভাইে প্রায় সব প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। তবে উপজেলা প্রশাসনের আঁওতায় সব প্রতিষ্ঠান সক্রিয় ছিল। প্রশিক্ষক সংকট এটা রূপগঞ্জের একার নয়। সারাদেশেই একই অবস্থা। স্থায়ী প্রশিক্ষক কোন উপজেলায়ই নেই।

পশ্চিমগাঁও মৎস খামারের মালিক শাহাদাত জানান, তিনি সম্প্রতি জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। জেলা থেকে সেই প্রশিক্ষণ সনদ জমা দিলে ঋণ পাবে বলে আশ্বস্ত করেছেন। কিন্ত রূপগঞ্জ উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার কাছে ওই সনদ জমা দিলে তিনি জামিনদারসহ বাড়ি ও জমির কাগজ পত্রের মুলকপি জমা দিতে বলেন। পরে তাদের শর্ত পুরণ করলেও প্রশিক্ষণের সময় বিভিন্ন খাতে খরচের পর ৬০ হাজার টাকা থেকে ৪৫ হাজার টাকা থাকে। ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়। এতে উপকারের বদলে ক্ষতি হয়েছে বলে দাবী করেন তিনি।
চনপাড়া পূনর্বাসন কেন্দ্রের বাসিন্দা হালিমা খাতুনের মেয়ে নাজনীন বলেন, আমি বিউটিশিয়ান হিসেবে প্রশিক্ষণ নিতে চেয়েছি। আমাকে একটি রেজিষ্ট্রারে স্বাক্ষর রেখেছে শুধু। পরে জানলাম প্রশিক্ষক নেই তাই আর যোগাযোগ করিনি।

ভুলতার পাঁচাইখা মিয়া বাড়ির বাসিন্দা সুরাইয়া আক্তার বলেন, আমি নারায়ণগঞ্জ জেলা যুব উন্নয়ন বিভাগের আঁওতায় পূর্বগ্রাম থেকে মৎস চাষের উপর প্রশিক্ষণ নিয়েছি। উপজেলায় সনদ ও মুল জমির কাগজ জমা দিয়ে ৬০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছি। তবে ভালো শিক্ষক না থাকায় তেমন বুঝিনি। তাই মাছ চাষ করতে ভয় সফল হবো কি না ভয় হচ্ছে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে রূপগঞ্জ উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা ই আর মাসুদ মজুমদার বলেন, ৪১ বিষয়ের মধ্যে ১৪টি বিষয়ের উপর প্রশিক্ষন দিয়ে থাকি। লিফলেট বিতরণ করে যুবকদের একত্র করে ২৫ জনের ব্যাচ করে বছরে ৪৭ লাখ টাকার অধিক ঋণ বিতরণের টার্গেট থাকে। তবে ব্যাচ সংকট বা সব বিষয়ের উপর দক্ষ প্রশিক্ষক না পাওয়ায় মাঝে মধ্যে বিপাকে পড়তে হয়। এসব সমস্যা উর্ধ্বতন মহলকে জানিয়েছি।

সূত্র জানায়, প্রশিক্ষনার্থীকে ঋণ পেতে আবেদনকারীর এবং জামিনদারের ০৩ কপি ছবি, নাগরিকত্ব সনদপত্র, প্রশিক্ষনের মূল সনদপত্র, জামিনদারের, সম্পত্তির মুল দলিল, পর্চা, দাখিলা, প্রকল্পের চুক্তিনামা ও প্রকল্পের জমির মালিকানার সমর্থনে দলিল, পর্চা ইত্যাদি দাখিল করতে হয়। জামিনদারের সম্পত্তি না থাকিলে আবেদনকারীর নিকট আত্মীয় সরকারী চাকুরীজিবি হলে তিনি তার নিয়ন্ত্রনকারী কর্মকর্তার মাধ্যমে জামিনদার হতে হয়।

এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ জেলা যুব উন্নয়ন বিভাগের উপ পরিচালক শাহরিয়ার রেজা বলেন, স্থায়ী প্রশিক্ষক নিয়োগ নেই। তাই কিছুটা সমস্যা মোকাবেলা করে আমাদের কার্যক্রম চলে। এককালীন সম্মানিভাতা ভিত্তিতে ভাসমান প্রশিক্ষক দিয়েই চালাতে হয়। রূপগঞ্জে নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলছে বলেই জানি। তবু যেসব সমস্যা সামনে আসছে উর্ধ্বতন মহলকে জানিয়ে সমাধানের চেষ্টা করবো। তিনি আরো বলেন, আবেদনকারীদের কাছ থেকে মঞ্জুরীকৃত ঋণের ৫% অগ্রীম সঞ্চয় নেয়া এবং ১৫০/- টাকার ননজুডিশিয়াল ষ্ট্যাম্পে অঙ্গীকারনামা গ্রহণ করার নিয়ম রয়েছে।
রূপগঞ্জ উপজেলা যুব উন্নয়ন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলা পর্যায়ে রয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ কোর্স। গবাদিপশু, হাঁস-মুরগী পালন, প্রাথমিক চিকিৎসা, মৎস্য চাষ ও কৃষি, মৎস্য চাষ, পোশাক তৈরী, কম্পিউটার বেসিক, রেফ্রিজারেশন এন্ড এয়ার-কন্ডিশনিং, ইলেকট্রনিক্স, ব্লক বুটিক, প্রিন্টিং ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আবার ০৭ দিন থেকে ২১ দিনের অপ্রাতিষ্ঠানিকের আঁওতায় রয়েছে পারিবারিক হাঁস-মুরগী পালন, ছাগল পালন, শুটকী তৈরী ও সংরক্ষণ, চামড়াজাত পণ্য তৈরী, চাইনিজ ও কনফেকশনারি, রিক্সা, সাইকেল, ভ্যান মেরামত, ওয়েল্ডিং ও ফটোগ্রাফিসহ ৪১টি বিষয়। রূপগঞ্জ উপজেলায় যার কেবল ১৪টি বিষয়ের প্রশিক্ষণ হলেও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষ প্রশিক্ষক সংকট বিদ্যমান থাকায় যুবকরা প্রশিক্ষন বঞ্চিত হচ্ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here