কনকনে শীতে রূপগঞ্জের গাছিদের খেজুরের রস সংগ্রহের কর্মব্যস্ততা

0
196
????? ?? ??????? ?????? ?????? khajur,rtv,rtvonline

নজরুল ইসলাম লিখন, রূপগঞ্জ : ব্রিটিশ আমলে খেজুর গুড় থেকে চিনি তৈরি করা হতো। এই চিনি ‘ব্রাউন সুগার’ নামে পরিচিত ছিল। খেজুরের রস থেকে উন্নতমানের মদও তৈরি করা হতো। এই চিনি ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চালান যেত। খেজুরের গুড় থেকে চিনি তৈরি না হলেও এখন পর্যন্ত বাঙালীর কাছে খেজুর গুড়-পাটালির কদর কমেনি।

তবে বিজ্ঞানের এই যুগে এখনও রস থেকে গুড়-পাটালি তৈরিতে প্রাচীন পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। গুড়-পাটালি তৈরিতে আধুনিকতা আনা গেলে এটিও রফতানি পণ্যের তালিকায় স্থান পেত। অবশ্য খেজুর গাছ অন্য গাছের মতো বপন করা বা সার মাটি দিতে হয় না। প্রাকৃতিক নিয়মেই মাঠে পড়ে থাকা খেজুর ফল (বিচি) থেকে চারা জন্মায়। সৃষ্টি হয় খেজুরের বাগান।

বর্তমান খেজুর গাছ ইটভাঁটির জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় বেশ আগের থেকে এ অঞ্চলে গুড়, পাটালির উৎপাদন বহুলাংশে কমে গেছে। এখন আর আগের মতো মাঠ ভরা খেজুর বাগানও নেই, এখন আর চোখে পড়ে মাঠে মাঠে রস জ্বালানোর দৃশ্য।

শীতের শুরু থেকেই গৌরব আর ঐতিহ্যের প্রতীক খেজুর গাছ থেকে সুমধুর রস বের করে গ্রামের ঘরে ঘরে শুরু হয় গুড়-পাটালি তৈরির উৎসব। গ্রামে গ্রামে পিঠা, পায়েশ, মুড়ি-মুড়কি ও নানা রকমের মুখরোচক খাবার তৈরি করার ধুম পড়ে যাবে। সকালে এবং সন্ধায় কাঁচা রস খেতে খুবই মজাদার। রসে ভেজা কাঁচি পোড়া পিঠার (চিতই পিঠা) স্বাদই আলাদা। নলেন, ঝোলা ও দানা গুড়ের সুমিষ্ট গন্ধেই যেন অর্ধ ভোজন। রসনা তৃপ্তিতে এর জুড়ি নেই। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে গাছিরা গাছ পরিষ্কার বা তোলা চাচার উপকরণ গাছি দা, দড়ি তৈরিসহ ভাঁড় (মাটির ঠিলে) ক্রয় ও রস জ্বালানো জায়গা ঠিক করাসহ বিভিন্ন কাজে রয়েছে ব্যতিব্যস্ত।

শীতের আগমনে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহি খেজুরের রস আহরনে খেজুর গাছ পরিচর্যায় রূপগঞ্জের গাছিরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। শীত শুরুর সাথে সাথে গাছিরা খেজুর গাছ প্রস্তুত করে রস আহরনের কাজ শুরু করেছেন। খেজুরের রস ও খেজুর গুড়ের পাটালি দিয়ে তৈরি বাংলার ঐতিহ্য পিঠা-পায়েস শীতের দিনে অন্যতম আকর্ষণীয় হয়ে থাকে। যদি সেই সোনালী দিন আজ আর নেই। তবুও উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকায় গাছিরা খেজুর গাছ তৈরির কাজ শুরু করেছেন।

গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের প্রতীক মধুবৃক্ষকে ঘিরে রূপগঞ্জের গ্রামীণ জনপদে শুরু হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। রস আহরনের জন্য প্রথমে হাতে দা ও কোমড়ে দড়ি বেঁধে খেজুর গাছে উঠে নিপুণ হাতে মনোযোগসহকারে গাছ চাছা-ছোলা করে। পরে ছোলা স্থানে নল বসানো হয়। কাক ডাকা ভোর থেকে সকাল ৮-৯ পর্যন্ত গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে। দুপুর পর্যন্ত এলাকায় ঘুরে ঘুরে রস বিক্রি করেন গাছিরা। আবার বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রস সংগ্রহের জন্য গাছে গাছে কলস বাঁধা এভাবেই ব্যস্ত সময় পার করছেন গাছিরা। পেশাদার গাছির পাশাপাশি মৌসুমি গাছিরাও রস সংগ্রহের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। এ সময় খেজুর গাছে শোভাপায় রসের হাড়ি। আর খেজুর রস দিয়ে পিঠাপুলি তৈরির পাশাপাশি খেজুর গুড় দিয়ে মুড়ির মোয়া, চিড়ার মোয়া তৈরির ধুম পড়ে এই শীতে। উপজেলার কায়েতপাড়া ইউনিয়নের বরুনা এলাকার গাছি জয়নাল মিয়া জানান, রূপগঞ্জে খেজুর গাছ আর আগের মত নেই। রাস্তার ধারে কিংবা বিলের আলে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে উঠা কিছু খেজুর গাছ রয়েছে। সেগুলো থেকে রস সংগ্রহ করছি। এখন আগের মতো বাণিজ্যিকভাবে খেজুর রস সংগ্রহ করা যায় না।

বাজারে প্রচুর চাহিদা থাকলেও গাছের অভাবে রস সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। খেজুর গাছের পরিমাণ অনেক কমে গেছে। নির্বিচারে এসব খেজুর গাছ কেটে সাবার করা হচ্ছে। মূূলত নতুনভাবে রোপন না করার কারণেই খেজুর গাছ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এমনিতে এসব গাছ কেউ শখেও রোপণ করে না। তার ওপর প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা এসব গাছও কেটে ফেলা হলে আমাদের এ পেশা ছেড়ে দিতে হবে। অনেকেই এখন আর খেজুর গাছ কাটা রস সংগ্রহকরা ছেড়ে দিয়েছেন গাছ কমে যাওয়ার কারনে। প্রথমত খেজুর গাছ কম আর কাটা বেশ কষ্টের। রসও তেমন পাওয়া যায় না। খেজুর গাছ খুব অবহেলিত একটি গাছ। কেউ এসব গাছের পরিচর্যা করে না।

ফলে অপরিপুষ্ট ও রুগ্ন হয়ে পড়া অধিকাংশ গাছ থেকে আশানুরূপ রস পাওয়া যায় না। তাই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে লাভবান হওয়া দূরের কথা, পরিশ্রমের দামও উঠে না। তবে রসের ভালো দাম পাওয়া যায়। শীতের পিঠাপুলির জন্যে এ এলাকায় রসের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। তিনি বলেন, এভাবে চলতে থাকলে একদিন গাছিরা খেজুর গাছ কাটা ছেড়ে দিবে। বর্তমানে যেভাবে বৃক্ষ নিধন শুরু হয়েছে তাতে এ ঐতিহ্য ধরে রাখতে সড়কের পার্শ্বে খেজুরের গাছ রোপনের উদ্যোগ না নিলে অছিরেই এ খেজুরের গাছ হারিয়েই যাবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here